দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
হায়ানাদের হিংস্র থাবায় রক্তাক্ত আগস্ট

হায়ানাদের হিংস্র থাবায় রক্তাক্ত আগস্ট

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। আগষ্ট বাঙালির ইতিহাসে একটি শোকাবহ মাস। বেদনাবিধুর ও কলঙ্কের কালিমায় কুলুষিত বিভীষিকাময় ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর মাস। স্বাধীনতা বিরোধী ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ও প্রেতাত্মারা বারবার আঘাত করছে আগষ্ট মাসকে ঘিরে। হায়ানাদের হিংস্র থাবায় পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্ট রক্তগঙ্গা বয়ে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীকার আন্দোলনের সুতিকাগার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে। ত্রিশ বছর পর বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ঘাতকচক্র আবার আঘাত হানে। এদিন রক্তাক্ত হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের পিচঢালা রাজপথ। জাতির জনককে হত্যা করে রক্তপিপাসা মিটেনি ঘাতকদের। ৭৫’র ১৫ আগাস্টের পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পুনরায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয় পঁচাত্তরে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার ওপর। এভাবেই হায়ানাদের হিংস্র থাবায় বারবার সৃষ্টি হচ্ছে রক্তাক্ত আগস্ট ট্র্যাজিডি।
সিংহ হৃদয়ের মানুষ বঙ্গবন্ধু ভেবেছিল, মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাস কারাগারে বন্দী রেখেও পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করার সাহস পায়নি। তাই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কোন বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে না। কিন্তু তাঁর এ বিশ্বাসে চির ধরিয়ে ৭১’র পরাজিত শত্রুরা উদ্দেশ্য হাসিল করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতাবিরোধী বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিকদের চক্রান্ত, পরাজিত পাকিস্তানি দোসরদের পরিকল্পনা এবং সেনাবাহিনীর বিপথগামী উচ্চাবিলাসী সদস্যরা পৈশাচিক কায়দায় গুলি করে সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি। একসঙ্গে তিন বাড়িতে হামলা করে মেতে উঠেছিল অদম্য রক্তপিপাসায়। নিষ্ঠুর কায়দায় একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ ও শিশুপুত্র সুকান্ত বাবু, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, আবদুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্ণেল জামিলসহ কয়েক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী। রাজনীতির সঙ্গে সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও নারী শিশুরাও রেহাই পাননি ঘৃণ্য কাপুরুষ এই ঘাতকচক্রের নিষ্ঠুর থাবা থেকে।
ইতিহাসের এ জগণ্যতম হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ৩৪টি বছর বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কেঁদেছে। খুনীচক্র ও তাদের দোসর, মদদদাতারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে এসব অপশক্তিরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার তো করেইনি, উল্টো আত্মস্বীকৃত খুনীদের প্রতিষ্ঠিত, পুরষ্কৃত এবং বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দুতাবাসে চাকরি দিয়ে রক্ষা করার পায়তারা চালিয়েছেন। এ সুযোগে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনারবাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে যিনি অহর্নিশি কাজ করে যাচ্ছেন, যিনি সামরিক ও স্বৈরতন্ত্রের যাতাকল থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি এনে দিয়েছেন, গণতন্ত্রকে যিনি সুসংহত করেছেন, দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করেছেন, যিনি শিশু ও নারী স্বাস্থ্য রক্ষায়, নারীর ক্ষমতায়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা পালন করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট প্রশংসিত এবং অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যিনি বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন, আমাদেরকে যিনি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, ঘোষণা করেছেন ভিশন-২০২১, যিনি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুর্বার গতিতে এগুচ্ছেন, বঙ্গবন্ধুর রক্ত যাঁর ধমনীতে প্রবাহিত, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যার চলার পথের পাথেয়, তাঁকেও হত্যা করার জন্য ঘাতকচক্র বারবার আগস্টকে বেছে নিচ্ছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তিনি বালাদেশের তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, উপমহাদেশ তথা এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৪০ বছর ব্যাপী সভাপতি দেশরত্ন শেখ হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নস্যাৎ এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিশীল চাকাকে অচল করে দেয়ার লক্ষ্যে ঘাতকচক্র এ পর্যন্ত ১৯ বার তাঁকে হত্যা করার হীন চেষ্টা চালায়।
কথায় আছে ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’। তাই শেখ হাসিনাকে প্রাণনাশের মরণপন চেষ্টা করেও ঘাতকচক্র ব্যর্থ হচ্ছে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত এবং পাকাপোক্ত করার মানসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের লেলিয়ে দেয়া বাহিনী ২০০৪ সালের একুশ আগস্ট পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজিডির পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা চালায়। ওই দিন শেখ হাসিনা এবং তাঁর দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে চিরতরে নেতৃত্বশুন্য করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আহুত জনসভায় নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। নেতা-কর্মীরা জীবন বাজি রেখে মানবঢাল তৈরী করে প্রিয় নেত্রীকে বাঁচিয়ে রাখেন। তবে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে গুরুতর আহত হন শেখ হাসিনা।
এবারও সৌভাগ্যক্রমে নেতাকর্মীদের আন্তরিকতায় মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ কৃপায় শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর প্রবীন রাজনীতিবিদ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এই গ্রেনেড হামলায়। অসংখ্য নেতাকর্মী সেদিনের গ্রেনেড বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন এবং অনেককেই বরণ করতে হয়েছে চিরপঙ্গুত্ব।
১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ ৩৪ বছর পর সম্পন্ন হলেও সকল আসামীর ফাঁসি হয়নি। হত্যার রাজনীতি চিরদিনের জন্য বন্ধের লক্ষ্যে আশা করছি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসি হওয়া পলাতক আসামীদের ধরে এনে অচিরেই ফাঁসির রায় কার্যকর হবে।
যে কোন বিবেকবান ব্যক্তি মাত্রই রক্তাক্ত আগস্ট চায় না। হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। বঙ্গবন্ধু অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, চিরঞ্জীব। শেখ হাসিনা অকুতভয়। মৃত্যুকে জীবন সাথী করেই তিনি বন্ধুর পথ পাড়ি দিচ্ছেন। তাঁর চলার পথ কখনই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তাই তাঁর কন্ঠে শোনা যায়-যদি কোন মানুষ মৃত্যুভয়ে ভীত থাকে, তাহলে সে জীবনের কোন মর্যাদা থাকে না।
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর, কুমিল্লা। ০১৮১৮৬৬৪০৩৪, E-mail:alauddinhm71@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com