দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
সংবাদ শিরোনাম
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া শিক্ষা জাতীয়করণ ‘সোনার পাথর বাটি’ পিতার স্বপ্ন ছিল শিক্ষা জাতীয়করণ কন্যার হাতে হোক বাস্তবায়ন হোমনায় ভ্রাম্যমান আদালতে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি এবং একাশির ১৭ মে বাঙালির ইতিহাসে দু’টি স্মরণীয় দিন হোমনায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধিকে গণধর্ষণের অভিযোগে আটক-৪ সমাজের দুর্গন্ধটুকু এখন আর কারো নাকে লাগেনা বাংলাদেশের বর্তমান শীতল রাজনীতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের শ্রেষ্ঠ সময় হোমনায় আওয়ামী যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত অতিক্রম করছে-শেখ হাসিনা ভারতের ‘প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার’ নীতিতে এক নম্বর পিলার হচ্ছে বাংলাদেশ-নরেন্দ্র মোদি
সমাজের দুর্গন্ধটুকু এখন আর কারো নাকে লাগেনা

সমাজের দুর্গন্ধটুকু এখন আর কারো নাকে লাগেনা

পিয়ারা বেগম।। আল্লাহর সত্তার অজস্র নেয়ামত ও রহমতের বারিধারা মানুষের উপর অহরহ বর্ষিত হচ্ছে। সেই সত্তাকে আমরা পার্থিব লোভে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে ভুলে যাচ্ছি। আর প্রতিনিয়ত জীবনের স্বাভাবিক মানবিকতাকেও উপেক্ষা করে চলেছি। স্রষ্টাকে বিস্মরণের কারণে আমাদের যাবতীয় চিন্তা-চেতনা-ভাবনায় আরো একটা বিষয় অনুপস্থিত তা হলো নৈতিকতা। ফলে নিজের উপর বিশ্বাস ও আস্থাটুকু পর্যন্ত আজ আমরা হারাতে বসেছি। এতে আমাদের মন-মননে গর্বোদ্ধত ভাব জেগে উঠছে। ফলে আত্মকেন্দ্রিকতায় আচ্ছন্ন আমাদের মন-মানসিকতা। তাই তো স্বার্থের কাদা-জল মাখা সমাজ এখন বিকৃত-কিম্ভূত-কিমাকার রূপ নিয়েছে।
তাছাড়া এমনতর প্রেক্ষাপটে, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, মূর্খতা, অজ্ঞতা এবং ধর্মান্ধতা ঝেঁকে বসেছে। তাছাড়া লোভী ও মুনাফাখোরদের রমরমা বানিজ্যের পসরার জয়জয়কার। তাদের লাগামহীন দৌরাত্ম্যের বিরূপ-বিরূপতায় সমাজ প্রায় আকণ্ঠ ডুবোডুবো। এদিকে জ্ঞানীরা কোনঠাসা। আধুনিক, তথ্য-প্রযুক্তির লাগামহীন অপব্যবহারে শিশু-কিশোর এবং তরুণদের একটা অংশ হয়ে পড়ছে বিষণ্ণ ও হতাশ। এতে বাড়ছে মনোদৈহিক অসুস্থতা ও হিংস্রতা। ফলে সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বেড়েছে অনৈতিকতা। বেড়েছে মূল্যবোধের সীমাহীন অবক্ষয়ও। ফলে, ছেলেমেয়েরা অভিভাবকের চোখের সামনে স্পষ্ট, নির্লজ্জভাবে অশালীন উক্তি করতেও দ্বিধা করছে না। এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের স্পষ্ট ও অকপট উক্তির জবাব দেওয়ার মত ভাষা আজ তিরোহিত। তাই তো মা-বাবাকে বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর করার কিছুই নেই।
তাছাড়া আমাদের দেশের মেয়েরা জন্মগত ভাবে কষ্টবিলাসী। জন্মের পর থেকে শুরু হয় চলাফেরায় পরিবারের বিধিনিষেধের বাড়াবাড়ি। মূলত রূপার শেকলে বাঁধা আবদ্ধ জীবন। বিয়ের পর শুরু হয় ঘরে-বাইরে চলাচলে কড়াকড়ি। এমন কী ওঠতে-বসতে দোষ ধরাধরি থেকেও নেই নিষ্কৃতি। এই যেন তামার শেকলে বাঁধা নতুন জীবন। তবুও মেয়েরা সামাজিকতা রক্ষার্থে ঘষেমেজে চক-চক,ঝকঝকে করে রাখে শেকলখানি। অভিনয়ে পারদর্শী নারী হৃদয় এতটুকু উজ্জ্বলতায় ব্যত্যয় ঘটতে দেয় না। নিদারুণ কষ্টভোগ করেও স্বামী-সন্তান-সংসারটাকে ভালোবেসে আঁকড়ে পড়ে থাকে। আর বার্ধক্যে শুরু হয় লোহার শেকলে বাঁধা বন্দীজীবন।। বয়সের ধাপ পরিবর্তনের সাথে সাথে পুরানো শেকল খুলে পরানো হয় নতুন শেকল। বদল কেবল শেকলের। কিন্তু কষ্টগুলো পার্থক্যের অনুভবের মাত্রটা দিনদিন হয়ে ওঠে অসহনীয়। হায় রে জীবন! তাতেও নেই নিষ্কৃতি। পায়ে শেকলের বেঁড়ি, মুখে কষ্টিপ এঁটেও অনেকেরই স্থান হয় না নিজ হাতে গড়া সংসারে। এমন কী, নারী হয়েও আরেক নারী কর্তৃক নির্যাতিত হতে হয় প্রতিনিয়ত। আসলে, মেয়েদের জীবন কই মাছের মতোই বড় শক্ত। তাই তো অনেকেই মনে করেন, এ দেশে অনেক নারীরা কৈ মাছের মতো উত্তপ্ত করাইয়ে পুড়ছে, ছটফট করছে। তবুও তারা লাফিয়ে পড়ছে না। কারণ, লাফালেই নিচে জ্বলন্ত উনুনে পড়ার আশংকা।
শেষমেশ নিগৃহীত হয়েও বাঁচার তাগিদে কেউ কেউ বিতাড়িত হয়ে স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এই তো গেল বর্তমানে সমাজে নারীদের জীবনাচারের করুণ চিত্র।
অনেকেই বলেন, সংসার জীবনে সুখী হওয়ার যে কয়টি গোপনমন্ত্র আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্ত্রীর অনুগত হওয়া। তার আদেশ-নির্দেশ, অক্ষরে অক্ষরে পালন করা। প্রবাদ আছে, আমাদের সমাজের পুরুষরা বরাবরই মাতৃলালিত এবং স্ত্রী চালিত। সুতরাং এই মোক্ষম অস্ত্রটি আমাদের আধুনিক সমাজের তথাকথিত আবেগ-বিবেক হীন মহিলারা ব্যবহার করে। তারা স্বামীকে ভেড়া বানিয়ে মেরুদণ্ডহীন করে রাখে। সংসারে স্বামীর কোন বাক স্বাধীনতা থাকে না। এমন স্ত্রী-শাষিত সংসারে স্বামী কেবল টাকা রোজগার করার মেশিন শুধুমাত্র। অর্থাৎ গোবেচারা স্বামী নামক মানুষটি সিংহীসুলভ স্ত্রীর কাছে ভেড়া স্বামী হয়ে বেঁচে থাকে কালের বোঝা হয়ে। স্ত্রীর ওপরে টুশব্দটি পর্যন্ত করার এতটুকু সাহস তাদের থাকে না। শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য অটুট থেকেও মানবিক বৈকল্যে অথর্ব মানুষ হিসেবে পরিবারে তার অবস্থান নড়বড়ে। এই সব নিগৃহীত পুরুষরা না পারে প্রকাশ করতে না পারে সইতে। শেষমেশ আত্মসম্মান আর সন্তানদের মুখ চেয়ে জীবন কাটিয়ে দেয় নরকযন্ত্রণা বুকে নিয়ে।
পক্ষান্তরে, আমাদের দেশের অনেক মেয়েদের জীবনটাও খাঁচা থেকে বের হওয়া পাখির মতো। উড়তে গেলেই মনে হয় পা শিকল দিয়ে আটকানো। কখনো বা মনে হয় জীবনটা স্রোতে ভেসে যাওয়া খালি কলসির মতো। স্রোত যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে তাকে যেতে হবে। কলসির ইচ্ছে অনিচ্ছের কোন মূল্য নেই। এক্ষেত্রেও তথাকথিত সিংহসুলভ স্বামীরা স্ত্রীকে ভেড়ী বানিয়ে রেখে বিকৃত আনন্দোল্লাসে মেতে ওঠে।
আমাদের সমাজের অধিকাংশ পরিবারে সংসারকে মূলত সংসার বলা যায় না। স্বামী-স্ত্রী দুজনের দুই মেরুতে তাদের অবস্থান। যে যার অবস্থানে একচ্ছত্র অধিপতি। এমন অসুখী দাম্পত্য জীবন অনেক সময় অসুখী, অসুস্থ সন্তানের জন্ম দেয়। তথাকথিত সংসারে মা-বাবারা নিজেদের ভোগ-বিলাস, আর প্রাচুর্যের ফুল শয্যায় প্রমোদ উল্লাসে বিভোর থাকে। কাজের বুয়া আর চাকর-বাকর পরিবৃত অবস্থায় তাদের সন্তানরা বড় হয়। উপরুন্তু অঢেল টাকা সন্তানের হাতে দিয়ে তারা দায়সারা দায়িত্ব পালন করে। তথাকথিত পিতামাতার সন্তানরাই বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসামাখা শাসন থেকে বঞ্চিত হয়। সত্যি বলতে কী, সেই সব সব অভাগা সন্তানদের বুকের শূণ্যতা কখনো সহজে পূরণ হয় না। আমাদের জানা প্রয়োজন যে, ভালোবাসা ও শাসন দুটোই সুসন্তান গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন।
আসলে, আমাদের সমাজে কিশোর অপরাধের প্রধান অন্যতম কারণ হচ্ছে শিশুর প্রতি ভালোবাসার অভাববোধ। যখনই শিশু চিন্তা করতে শুরু করে যে, সে তার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। কেউ তাকে আদর করে না, ভালোবাসে না। তখন তার প্রবণতা সঠিক থেকে সরে আসে। আর ক্ষতজ্বালা ভুলতে নিজের ওপর প্রতিশোধ নেয়। তখনি স্বেচ্ছায় অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হতে থাকে। গভীর ভালোবাসা আর মমত্ববোধের অভাবে আমাদের হতভাগ্য কিশোররাই মাদকাসক্তির মরণ নেশায় আত্মহুতি দেয়। কিংবা ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয়। এতে দিন দিন বেড়ে চলেছে বিপথগামীতার সংখ্যা। আরো বেড়ে চলেছে কিশোর গ্যাংদের দৌরাত্ম্য।
বর্তমানে আমাদের সমাজে অহরহ নারী বা শিশুরা ধর্ষিত হচ্ছে। এই নিয়ে মানববন্ধন হচ্ছে। সরব প্রতিবাদও হচ্ছে। কয়দিন থাকে এমনি সরগরম। এ পর্যন্তই। আইনের আশ্রয়ে গেলে ভয়-ভীতি প্রদর্শন আর হুমকী-ধামকী তো আছেই। তারপরে হয়তো অনেকের ভাগ্যে ঘটে সমাজচ্যুত। আর ধর্ষক বুক উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বিচার চাইতে গেলে হয় প্রতারিত। আর প্রতারণা হচ্ছে বিষাক্ত পানির মতো যে দিকে যায় সমূলে ক্ষতিগ্রস্ত করে ছাড়ে।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে সংসার জীবনে আমরা অনেকেই কোনো না কোনো দিক দিয়ে অসুখী। অথচ সবাই জানে আমরা খুব সুখী। মূলত বাইরে ঝকঝকে, তকতকে ইস্ত্রী করা পোশাকের মতোই দারুণভাবে মসৃণ ও পালিস করে রাখি। নিজেকে এতটুকু বুঝতে দেই না কাউকে। আসলে আমরা সবাই এক একজন নিপুণ, দক্ষ কারিগর। তাই তো আমাদের মুখোশটাকে এতই সুনিপুণভাবে জনসম্মুখে উপস্থাপন করি যেন, বুঝার জন্য এতটুকু ফাঁক-ফোকর না থাকে। সত্যিটা এই যে,পরিবারে কেউ না কেউ, কোন না কোন কারণে কারো দ্বারা নির্যাতিত এবং নিপীড়িত । ফলে আখের ছোবড়ার মতো রস-কষহীন, অস্তিত্বহীন হয়ে সংসারে পড়ে থাকে। তারা ছাই ফেলতে অব্যবহৃত ভাঙ্গা কুলার মতো। তাদের অবহেলিত জীবনের মুহূর্ত কাটে পানসে আলোয় পরিব্যাপ্ত হয়ে। তাদের কষ্টগুলো উম্মতাল ঢেউয়ের মতো আছড়ে পিছড়ে পড়ে সত্য। আবার স্তিমিত হয়ে যায় সমুদ্রের ঢেউ এর মতো। সমুদ্রের ঢেউগুলো উদ্যত ফণা তুলে ফোঁসফোঁস শব্দ তুলে তীব্রবেগে গড়িয়ে গড়িয়ে তীরে এসে হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে আবার ফিরে যায়। কোনভাবেই প্রতিবাদী হতে পারে না তারা। নারী মনের আকাঙ্ক্ষা এভাবেই সোচ্চার হয়ে সামান্য বাঁধা পেয়েই মাথা নুইয়ে তাদের বুকের ভেতর লুকিয়ে পড়ে।
শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষও আছেন যারা পারিবারিক, সামাজিকভাবে নিগৃহীত। তাদের ভাবতে হয় পারিবারিক অবস্থান ও মান-মর্যাদার কথা। ভাবতে হয় ব্যক্তিগত আত্মসম্মানের কথা। সার্বিক অবস্থানের কথা বিবেচনা করে কষ্টকে বরণ করে নেন। ধরে নেয়, এটাই তাদের নিয়তি। এই স্বঘোষিত তত্ত্বে বিশ্বাসী মন নীরবে, নিভৃতে শত কষ্টের দ্যোতনাগুলোকে বুকে চেপে শরবিদ্ধ পাখির মতো ডানা ঝাপটায়। একসময় নিথর হয়ে পড়ে থাকে কষ্টের কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে। পরিবারপতি বা পরিবারপত্নীরা মূলত সব অন্যায়কেই তাদের স্বঘোষিত ন্যায়ে পরিণত করে মেনে নিতে বাধ্য করায়। পরিবেশ পরিস্থিতি এমন হয় যে, তখন নির্যাতিত ব্যক্তি মনে করেন, কুকুরের কামড় খাওয়ার চেয়ে তাকে পথে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। কারণ, কুকুরটাকে মেরে ফেললেও তার কামড় তো ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই তো দাঁতে দাঁত চেপে তিলেতিলে, ক্ষয়েক্ষয়ে তারা নীরবে সয়ে যায়। আর এটা ছাড়া বিকল্প কোন পথ তাদের খোলা নেই।
আমরা জানি, শরীরের ঘা ঢাকলে শরীরের পঁচা ক্ষতটুকু আড়াল করা যায় কিন্তু গন্ধটাকে কখনো ঢেকে রাখা যায় না। কিন্তু চরম বাস্তবতা এই যে, আমাদের সমাজ এমনি জড়, এমনি জরাহত যে, চারিদিকে দূষিত বিষবাষ্পে ছেয়ে গেছে। এখন চারদিকে শুধু দুর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ। এমতাবস্থায় সামান্য দুর্গন্ধটুকু এখন আর কারো নাকে ধরে না। আর কে শুঁকবে কার গন্ধ? কে শুনবে কার কথা? কে সারাবে কার ব্যথা? যার যার গন্ধ নিয়েই সে সে বিব্রত। তাছাড়া জীবনটা তো নাটকের মতো, নাটকের দর্শকদের দৃষ্টি থাকে মঞ্চের দিকে, দর্শকের দিকে নয়।
আসলে, আমাদের পুরো জীবনটাই একটা নাট্যশালা। তবে মঞ্চের নাটক চলে পর্দার সামনে আর জীবনের নাটক চলে পর্দার অন্তরালে। তাই মঞ্চ নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চোখে দেখা যায়। কিন্তু জীবন নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা পর্দার অন্তরালেই থেকে যায়, এক্কেবারে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে!
লেখকঃ কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com