দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
শোকাবহ ১৫ আগস্ট এবং বর্তমান প্রজন্ম

শোকাবহ ১৫ আগস্ট এবং বর্তমান প্রজন্ম

ছবিঃ সংগৃহিত

মো. সাজ্জাদ হোসেন।। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন। বাঙালি জাতির সকল
ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংসের দিন। বাঙালি জাতির স্বপ্ন ভঙ্গের দিন। ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব-পরিবারে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি জাতির কলঙ্কজনক দিনের নতুন অধ্যায়। যেটা শুরু হয়েছিল ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার আরেক বীর সন্তান শেষ নবাব সিরাজউদদৌলাকে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে। মীর জাফর, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ প্রমুখ গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলার রাজসিংহাসন ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়েছিল। মীর জাফর আলী খাঁর গভীর ষড়যন্ত্রের জন্য বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদদৌলাকে মোহাম্মদি বেগের হাতে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছিল। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল ১৯০ বছর এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর বাঙালি জাতিকে গোলামির জীবন কাটাতে হয়েছিল । ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পাকিস্তানের সামরিক জান্তা নিরীহ বাঙালিদের উপর চালিয়েছিল নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার। জুলুমের শিকার হয়েছিল এদেশের মেহনতি মানুষ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তেইশ বছরের শোষণ জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জেলে কাটাতে হয়েছে ৪৬৮২ দিন। বঙ্গবন্ধুর আপোষহীন নেতৃত্বে বাঙালি জাতি পেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।
দার্শনিক হেগেলের মতে “মানুষের যাবতীয় সৃষ্টির মধ্যে রাষ্ট্রই হচ্ছে তার সৃষ্টিশক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশ।” পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন ও ভারত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে বীরের বেশে পদার্পণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা। অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলতে শুরু করেছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারিদের দোসর যারা বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যারা স্বীকৃতি দিতে চায়নি বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়ানোটাকে যারা মেনে নিতে পারেনি তারাসহ দেশী বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীর মাধ্যমে একদল বিপথগামী সেনা সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সকল
সদস্যদেরকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল। বাংলার আরেক মীর জাফর খন্দকার মুশতাক আহাম্মদ এর গভীর ষড়যন্ত্রে এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল মেজর ডালিম, খন্দকার আবদুর
রশিদ, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, আজিজ পাশা, এম রাশেদ চৌধুরী, আবদুল মাজেদ, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান, নূর চৌধুরী, ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, এ কে এম মহিউদ্দিন। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ৫ জন খুনির ফাঁসির রায় বাস্তবায়ন হয়েছে। ২০২০সালের ১২ এপ্রিল খুনি আবদুল মাজেদেরও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এখনও ৬ জন খুনি বিদেশের মাটিতে পলাতক রয়েছে ।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে শুক্রবার ভোর ৫.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর তিন সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল, অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধু রোজি জামাল কে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় । ছোট ভাই শেখ নাসের রহমান,ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবত, শহীদ সেরনিয়াবত, বোন বেগম আনজুমান,শেখ ফজলুল হক মণি তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি নিরাপত্তা কর্মী কর্ণেল জামিল, আবদুল মঈন খান রিন্টু,ডিএসপি নুরুল ইসলাম সহ আর ও অনেককে সেইদিন নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল হায়েনার দল । সারা বিশ্বের যত রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে তার মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও ন্যাক্কার জনক হত্যাযজ্ঞ বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের হত্যাকান্ড। অন্তঃসত্ত্বা মা ছাড়াও চারজন শিশুকে (শেখ রাসেল,সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু,আরিফ এবং বেবী ) সেইদিন নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল খুনচিক্র। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণিত ও পৈশাচিক হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা বিদেশে থাকার কারণে সেদিন প্রাণে বেঁচেছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার বর্গকে খুন করার পরেও থেমে থাকেনি হায়েনার দল। ৩রা নভেম্বর জেল খানায় বঙ্গবন্ধুর চার জন বিশ্বস্ত সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহাম্মেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচএম কামরুজ্জামান কে খুন করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কে নেতৃত্বশূন্য করে দিতে চেয়েছিল। খুনিচক্র ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই বাঙালির মন থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা সহজ হবে। কিন্তু না সেই খুনিচক্রের উদ্দেশ্য আজও সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নাম আজও তার সন্তানেরা মনে রেখেছে। জাতির পিতার সূর্য সন্তানরা আজও শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করে তুলে রাজপথ। কে বলেরে মুজিব নাই,মুজিব মোদের চেতনায়। এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে । বঙ্গবন্ধুর দেহ থেকে প্রাণ পাখিটাকে বের করে নিতে পেরেছে ঘাতকের দল। কিন্তু তার আদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলতে পারেনি। আজও কবির কবিতায় লেখকের লেখনিতে চির অমর
হয়ে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
“করে দিল জিনজির খান খান গোলামির, বাংলার কোন জন, এইবার তবে শোন, নাম তার শেখ মুজিবুর রহমান।”
“যতদিন ডাকবে পাখি ফুটবে ফুল বইবে বাতাস, রইবে নদী প্রবাহমান। ততদিন এ বাংলার বুকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো থাকবে জেগে তুমি হে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।”
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ ও আর্দশ বাস্তবায়নের জন্য তার সুযোগ্য কন্যা জননত্রেী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদশের কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, ক্ষেতমজুর, শিক্ষক ,উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ সকল পেশার মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এদেশের র্সূয সন্তানরা জাতির পিতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবেই। এদেশের লাখ তরুণ আজও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে “মুজিব মানে মুক্তি পিতার সাথে সন্তানের না- লেখা প্রেম চুক্তি ”। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ বাঙালির মুখে মুখে উচ্চারিত হয় অন্নদা শংকর রায়ের সেই কবিতাখানি-
“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”
লেখকঃ প্রভাষক, লাউর ফতেহপুর ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ কলেজ, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com