দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
সংবাদ শিরোনাম
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকরা জাতীয়করণ ফোবিয়ায় আক্রান্ত।। দাওয়াই আপনাকেই দিতে হবে চলছে ঢিলেঢালা লকডাউন! স্বাস্থ্যবিধি উধাও সংকটের বেড়াজালে বন্দি শিক্ষকদের জীবন শিক্ষা জাতীয়করণ হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সর্বোপরি সরকার আগে জীবন পরে জীবিকা- ওবায়দুল কাদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে।। পিছিয়ে যেতে পারে আরো দু’মাস লকডাউনে নতুন ৬ শর্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বারে মতো শপথ নিয়েছেন মমতা ব্যানার্জী মার্কেট ও শপিংমলে ভিড়ের দৃশ্য দেখে মনে হয় না দেশে করোনা মহামারি চলছে! খাল খনন প্রকল্পের নামে নয়-ছয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবধান বাণী
শিক্ষা হাঁটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে

শিক্ষা হাঁটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে গোটাবিশ্ব এখন মৃত্যুপূরী। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সবকটি দেশেই করোনার নিষ্ঠুর থাবা। কোথাও কোন ভালো খবর নেই। প্রিন্টিং ও ইলেকট্রণিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার যেদিকে চোখ রাখি শুধু আক্রান্ত আর মৃত্যু সংবাদ। ভালো সংবাদ যেন সোনার হরিণ। ভালো খবরের জন্য মানুষ আজ তৃষ্ণার্ত। করোনার হিংস্র থাবায় অচল জীবনজীবিকা ও অর্থনীতির চাকা, বিপর্যস্ত শিক্ষাপঞ্জি, চরম বিপাকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দুর্দশার অন্ত নেই।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে কোচিং সেন্টারও। দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়ে আগামী ২২ মে পর্যন্ত ছুটি বর্ধিত করা হয়েছে। এতে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চলেছে। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষায় একটি গতি এসেছিল। শহর এবং গ্রামের মধ্যে শিক্ষায় ব্যবধান কমে এসেছিল। সেটি এখন প্রচন্ড হোঁচট খাবে। শ্রমজীবী অনেক পরিবারের সন্তানদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা আছে। বেড়ে যেতে পারে বাল্যবিবাহের হার। আরও নানা সমস্যা হবে যা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমখি করে তুলবে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করে বাস্তবতার নিরিখে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে শিক্ষাপঞ্জিকে।
করোনা মহামারিতে প্রায় ১৪ মাস ধরে বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান। বন্ধ আছে সব ধরনের পরীক্ষা। থমকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম। তবে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতির পাঠদান চলছে। কিন্তু তাতে শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না। বরং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দফায় দফায় পিছিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ। প্রায় পৌনে ৪ কোটি ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। করোনায় শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং সুদূরপ্রসারী। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা চরম নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। তাই সার্বিক শিক্ষা পুনরুদ্ধারে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেয়া খুবই জরুরি।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও বড় ধরনের আঘাত এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংগত ও যৌক্তিক কারণেই বন্ধ রাখা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে ২০২০ সালের জেএসসি, জেডিসি এবং পিইসি পরীক্ষা। অর্ধবাষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি। দেয়া হয়েছে অটোপাস। এইচএসসিতেও জেএসসি ও এসএসসি’র ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে অটোপাস দেয়া হয়েছে। টেলিভিশন, অনলাইন, বেতার ও মুঠোফোনের মাধ্যমে সরকার পড়াশোনা চালু রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া কতটুকু সফল হয়েছে তা বিবেচনার দাবি রাখে।
কীভাবে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়, তা নিয়ে সব উন্নয়নশীল দেশই হিমশিম খাচ্ছে। এটি আমাদের জন্যও বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে মূল্যায়ন হয় শ্রেণিকক্ষে, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এবং পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু করোনার কারণে সব থমকে গেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ৯ মাসে লেখাপড়ার একটা বড় ক্ষতি হয়েছিল। এরপর গত ৫০ বছরেও শিক্ষায় এতবড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। এখন এ ধকল কাটিয়ে উঠতে উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক।
গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ বছর ৩০ মার্চ খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হলেও করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ছুটি ২২ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের জন্য অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে বিকল্প পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব শিক্ষার্থীর কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে অংশ নিয়েছে। ব্র্যাকের সমীক্ষা মতে, টেলিভিশন পাঠদানে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ অন্তত অর্ধেক শিক্ষার্থীই দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের বাইরে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণের অধীনে এসেছে। আর স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ৮৫ শতাংশকে লেখাপড়ার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, করোনায় শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও সমাজের ওপর নানান দিক থেকে প্রভাব পড়তে পারে। বেড়ে যেতে পারে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার। করোনার ফলে শিক্ষার্থীরা দুই কারণে আর স্কুলে নাও ফিরতে পারে। প্রথমটি- দীর্ঘ শিখন বিরতির কারণে একটি অংশ পাঠ না পারা ও বোঝার পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। দ্বিতীয়টি- সম্ভাব্য দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপতিত হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যেতে পারে। আর ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মেয়ে শিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরেপড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে। এ বিষয়ের সঙ্গে সন্তান জন্ম দেয়া ও মৃত্যুর সম্পর্ক বিদ্যমান। এমনটি ঘটলে বহু কষ্টে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ শিক্ষা, নারী শিক্ষা ও মাতৃ-শিশু মৃত্যুতে যে অর্জন করেছে তা ম্লান হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এবার আসা যাক মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের কথায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা করোনাকালে প্রাপ্য সুবিধাদি ষোল আনা পেলেও বিপাকে পড়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, স্বল্প বেতনভোগী বেসরকারি শিক্ষকরা সাধারণত প্রাইভেট টিউশনী ও কোচিংয়ের এর উপর নির্ভর করে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে থাকেন। যা এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা বিদ্যালয় থেকে কিছু বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বন্ধ থাকায় এখন এটাও নেই বললেই চলে। বিশেষ করে নন-এমপিও এবং কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকরা আছেন চরম বিপাকে। মোদ্দাকথা বেসরকারি শিক্ষকরা এখন মোটেও ভালো নেই। তারা না পারছে কইতে না পারছে সইতে।
করোনায় শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে উঠার লক্ষে এবং শিক্ষার চাকা সচল রাখার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থীরা প্রিটেস্ট বা টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা দশম শ্রেণিতে ক্লাস করতে পেরেছে মাত্র আড়াই মাস। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা দ্বাদশ শ্রেণিতে অটো পাশ নিয়ে উঠেছে। দ্বাদশ শ্রেণিতে একদিনও সরাসরি ক্লাস করতে পারেনি তারা। এ কারণে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচিতে তাদের পরীক্ষা নেয়া হবে। অন্যদিকে গত বছর বিলম্বে ভর্তি করা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষার সময় এসে গেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা একদিনও ক্লাসে বসতে পারেনি। একই অবস্থা ২০২১ সালের জেএসসি পরীক্ষার্থীদের। শ্রেণি পাঠদান ছাড়াই তাদের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বছরের জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মে মাসে স্কুল কলেজ খোলা সম্ভব হলে পরীক্ষার আগে যথাক্রমে ৬০ ও ৮৪ দিন ক্লাস নেয়ার কথা আছে এসব পরীক্ষার্থীর। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেটা কতটা সম্ভব হবে সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদিও এসএসসি পরীক্ষা নেয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা বোর্ডগুলো ফরম পূরণ অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া প্রশ্নপত্র তৈরি ও মুদ্রণের কাজ করে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড সুত্রে জানা যায়।
করোনার সংক্রমণ একদিন শেষ হয়ে যাবে, মানুষের জীবনজীবিকা স্বাভাবিক হয়ে যাবে, মানুষ স্বজনহারা শোকও হয়তো কাটিয়ে উঠবে; কিন্তু শিক্ষার ক্ষত থেকে যাবে দীর্ঘদিন। শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং যথাযথ বাস্তবায়ন। প্রত্যাশা করছি বিশ্ববরেণ্য পরিকল্পনাকারি ও চিন্তাবিদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষাক্ষেত্রে নববিপ্লব ঘটিয়ে এ ধকল সামাল দিবেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com