দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
শিক্ষা জাতীয়করণ দাবিটা শিক্ষকদের প্রয়োজনটা রাষ্ট্রের

শিক্ষা জাতীয়করণ দাবিটা শিক্ষকদের প্রয়োজনটা রাষ্ট্রের

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। শিক্ষা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি শিক্ষক সংগঠননের নেতৃবৃন্দই শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে শিক্ষা জাতীয়করণের জোর দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের এ কথা শুনার যেন কেউ নেই। কথায় আছে, “যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়া পড়শীর ঘুম নেই।” শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। জাতির মেরুদন্ড ঠিক রাখার দায়িত্ব সাধারণত রাষ্ট্রের উপরই বর্তায়। অথচ বেসরকারি শিক্ষকরা শিক্ষা জাতীয়করণে যতটা হাহুতাশ করছে, সরকারের উচ্চমহল কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় জাতীয়করণ নিয়ে তেমন আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং এসডিজি-৪ বাস্তবায়নে শিক্ষা জাতীয়করণের কোন বিকল্প নেই। প্রয়োজনটা যে রাষ্ট্রেরে এতেও কোন সন্দেহ নেই। শিক্ষা জাতীয়করণ হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, সর্বোপরি সরকার।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় খুব একটা আসে না বললেই চলে। যদিও বা কেউ আসে, কিছুদিন যেতে না যেতেই এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশার দিকে ধাবিত হয়। এর মূল কারণ শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকরা পাহাড়সম বৈষম্যের শিকার। তাই মেধাবী ও তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য নিরসন এবং শিক্ষা জাতীয়করণ অত্যাবশ্যক।
এমপিওভূক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন শিক্ষা জাতীয়করণ। কিন্ত এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সরকার ইতমধ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজ জাতীয়করণ করেছেন। বিচ্ছিন্নভাবে জাতীয়করণ করে তেমন কোন সুফল পাওয়া যাবে না। এতে শিক্ষকদের মধ্যে আরও ক্ষোভের সঞ্চার ঘটেছে। একটু গভীরে চিন্তা করলে দেখা যায় শিক্ষা জাতীয়করণে লাভ বহুমাত্রিক। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে জাতীয়করণে বেশ সুফল পাওয়া যাবে। যেমন-
১. বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাধ্যমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হার সন্তোষজনক হলেও শিক্ষার গুণগত মান প্রশ্নাতীত নয়। শিক্ষা জাতীয়করণ হলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতায় আগ্রহী হবে এবং নিঃসন্দেহে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।
২. বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য বিরাজমান। পাঁচ লক্ষাধিক বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা আজ খাদের কিনারে? তাদের হৃদয়ে আজ রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীরা ২০১৫ সাল থেকে ৫% ইনক্রিমেন্ট পেলেও বেসরকারি শিক্ষকরা পেয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশির্বাদে ২০১৮ সাল থেকে। তাও আবার কোনরকম বকেয়া ছাড়া। মরার উপর খাড়ার ঘা! এ আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই বাড়তি কোন সুবিধা ছাড়াই অতিরিক্ত ৪% কেটে নেয়া হচ্ছে? বেসরকারি শিক্ষকরা মাত্র ২৫% উৎসব ভাতা পাচ্ছে। তাদের বাড়ি ভাড়া মাত্র ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, সন্তানের শিক্ষা ভাতা একেবারেই নেই। তাদের চাকরিতে কোন বদলী নেই? যেখানে শুরু সেখানেই শেষ!
একই সিলেবাস ও একই কারিকুলাম পড়িয়ে সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা পাবে ১০০% উৎসব ভাতা আর বেসরকারি শিক্ষকরা ২৫%, তারা পাবে বেতন আর বেসরকারি শিক্ষকরা অনুদান। সবই কাকতালীয় কারবার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল, শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলা। এদেশের ভূখানাঙ্গা ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানো। তাদের অধিকার আদায়ের জন্যই তিনি লড়াই করেছেন, জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় জেলে অন্তরীণ থেকেছেন। স্বপ্ন দেখেছেন একটি বৈষম্যহীন ও সুখী সম্মৃদ্ধশালী সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার। জাতীয়করণ হলে বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
৩. এমপিওভূক্ত বেসরকারি শিক্ষকরা এখন নানা দাবিতে আন্দোলনরত। তারা জাতীয়করণ ফোবিয়ায় আক্রান্ত। অপ্রিয় হলেও সত্য যে তারা শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেয়ার চেয়ে আন্দোলন এবং বিকল্প পন্থায় অর্থ উপার্জনের দিকেই বেশি মনোযোগী। যদিও কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এখন শ্রেণির কাজ বন্ধ রয়েছে। তাই শিক্ষা জাতীয়করণ হলে এহেন অচলাবস্থার নিরসন হবে।
৪. দেশে বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে সরকারি স্কুল-কলেজের সংখ্যা অতি নগণ্য। এসব প্রতিষ্ঠানে সুযোগ সুবিধা বেশি থাকলেও সাধারণ জনগণের ছেলেমেয়েরা ভর্তির সুযোগ পায় না বললেই চলে। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানেরা স্বল্প খরচে সরকারি স্কুল কলেজে লেখাপড়া করার সুযোগ পেলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা উচ্চহারে বেতন দিয়ে বেসরকারি স্কুল কলেজে লেখাপড়া করছে। শিক্ষা জাতীয়করণ হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ব্যয় অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
৫. সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে এসডিজি-৪ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। কিন্তু শিক্ষা বেসরকারি রেখে এ লক্ষমাত্রা অর্জন কতটুকু সম্ভব তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয় লক্ষমাত্রা অর্জনে শিক্ষা জাতীয়করণের কোন বিকল্প নেই।
উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলো বিবেচনায় সার্বিকভাবে বলা যায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই অনতিবিলম্বে শিক্ষা জাতীয়করণ করা উচিত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ছাড়া এদেশে কোন কিছুই হয় না। সবকিছু আপনাকেই করতে হয়। কথাটি আপনার মনঃপুত না হলেও দেশবাসির মনের কথা এটি। আপনি সবই জানেন ও বুঝেন। বেসরকারি শিক্ষকদের ভাগ্যোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক মুক্তিও আপনাকে ছাড়া হবে না। তাই আপনার একজন সুহৃদ হিসেবে এ অধমের মিনতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষে এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করে তাদের চোখের পানি মুছে দিন। প্রত্যাশা করছি আপনার ঐতিহাসিক আরও একটি সিদ্বান্ত জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে অনেক দুর। আপনি পেরেছেন, পারেন এবং পারবেন। আপনার কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। আপনি নিজেও খ্যাতির চূড়ায় আসীন।
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর, কুমিল্লা, ০১৮১৮৬৬৪০৩৪

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com