দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
ভোট বিমূখতা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত

ভোট বিমূখতা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ভূঞা।। নির্বাচন হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য প্রতিনিধিকে বেছে নেয়। সপ্তদশ শতক থেকে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক গণতন্ত্রে প্রতিনিধি বাছাইয়ের উপায় হিসেবে নির্বাচনের সার্বজনীন ব্যবহার করা হচ্ছে। গণতন্ত্র ও নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র হয় না আবার গণতন্ত্র ছাড়া নির্বাচন প্রায় অর্থহীন।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। আর এ নির্বাচনটি হওয়া চাই প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ এতে কোন সন্দেহ নেই। সাংবধিানিক রেওয়াজ অনুযায়ী বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচনগুলোও যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকল রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, নির্বাচনগুলো অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ হচ্ছে না এবং জনগণ ভোটাবিমূখ। যাহা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, বিশ্ব ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথে যেমন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে তেমনি এক সময় বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গণে আবাহনী ও মোহামেডান ফুটবল দ্বৈরথেও দেশের মানুষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যেত। একই অবস্থা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি মানেই তুমুল প্রতিদ্বন্ধিতা, জমজমাট লড়াই। জয় পরাজয় যাই হোক ৯১, ৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন এরই সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন হচ্ছে একতরফা, কোনরূপ প্রতিদ্বন্ধিতা নেই বললেই চলে। তাছাড়া ভোটারও যেন ভুলে গেছে ভোটাধিকার প্রয়োগ নাগরিক অধিকার এবং কর্তব্য। সম্প্রতি কিছু নির্বাচনে এমন হতাশাব্যঞ্জক চিত্রই ফুটে উঠেছে।
গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হলো সিরাজগঞ্জ-১ এবং ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচন। সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩২৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। অপরদিকে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সেলিম রেজা পেয়েছেন মাত্র ৪৬৮টি ভোট। ঢাকা-১৮ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ হাবিব হাসান ৭৫ হাজার ৮২০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন এবং বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন পেয়েছেন ৫ হাজার ৩৬৯ ভোট। ঢাকা ও সিরাজগঞ্জের দু’টি উপনির্বাচনের ফলাফল এবং ব্যবধান খুবই বিস্ময়কর। বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজার ৪৬৮টি ভোট প্রাপ্তি সত্যিই হাস্যকর। আর ঢাকায় ভোট-বিমুখ মানুষের সংখ্যা যেন দিন দিন বাড়ছেই। ঢাকা-১৮ আসনে ৮৫.৮২ শতাংশ মানুষ ভোট দেননি। এ আসনে ভোট পড়েছে মাত্র ১৪.১৮ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’টোই দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন। বর্তমানে সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রায় ৪০ ভাগ ভোট রয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, বিএনপিরও যথেষ্ট ভোট রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো বিএনপি না হয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা কেন ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছে না এ প্রশ্ন আজ সঙ্গত কারণেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলে কি ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রয়োজন বোধ করছেন না? নাকি নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাহীনতা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। অন্তত গণতন্ত্রের স্বার্থেই এহেন পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে।
উল্লেখ্য যে, গত ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৫ আসনের নির্বাচনে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৭১ ভোটের মধ্যে মাত্র ৪৯ হাজার ১৪১টি ভোট পড়েছে। ভোট প্রদানের হার মাত্র ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ নির্বাচনে ৪৫ হাজার ৬৪২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনু। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহম্মেদ পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৯২৬ ভোট। এ ছাড়া গত ২১ মার্চ ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ১৫ হাজার ৯৯৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম ধানের শীষ প্রতীকে পান মাত্র ৮১৭ ভোট এবং জাতীয় প্রার্থীর হাজী মো. শাহজাহান মাত্র ৯৭ ভোট।
নির্বাচনের এ চিত্র প্রমাণ করে দেশে রাজনৈতিক দলগুলো নিস্ক্রিয় কিংবা দলের সাথে জনসম্পৃক্ততা নেই। বিশেষ করে দেশে বিরোধীদল আছে এ কথা ভাববার কোন অবকাশ নেই। নির্বাচন কমিশনের প্রতিও ধীরে ধীরে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। সার্বিক বিচারে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা অনেকটা গুরূত্বহীন হয়ে পড়ছে। বিষয়টি গণতন্ত্রের জন্য কখনই শুভকর হতে পারে না। এহেন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। নির্বাচন কমিশন, সরকার, এমনকি বিরোধীদল কেউ এর দায় এড়াতে পারেন না। তাই কারো উপর দায় না চাপিয়ে সকলকেই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার!

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com