দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
বেসরকারি শিক্ষকদের রাইফেল আছে গুলি নাই!

বেসরকারি শিক্ষকদের রাইফেল আছে গুলি নাই!

ফাইল ফটো

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। শিক্ষকতা পেশা নয় একটি মহান ব্রত। যিনি নৈতিকতার আদর্শে সমুজ্জ্বল, যিনি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে জ্ঞান তৃষ্ণা জাগিয়ে, মনের সুকুমার বৃত্তিগুলোর পরিচর্যা করে শিক্ষার্থীকে আদর্শ মানুষে পরিণত করেন তিনিই তো শিক্ষক। সততা, নৈতিকতা, উদারতা, আধুনিকতা, ব্যক্তিত্ব তথা সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ একজন আদর্শ শিক্ষকের চারিত্রিক ভূষণ। শিক্ষকতা হচ্ছে সম্মানজনক একটি মহান পেশা এবং পৃথিবীর সকল পেশার সেরা পেশা। শিক্ষক হচ্ছেন সভ্যতার ধারক-বাহক। শিক্ষক স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে শিক্ষার্থীদেরকে বিশুদ্ধ জ্ঞান, মানবিক আর নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত এবং দিক্ষীত করে গড়ে তুলেন দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে। ন্যায়-বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি আদর্শ জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার আর শিক্ষকরা হলেন তার সুনিপুণ কারিগর।
শিক্ষক সম্পর্কে বিভিন্ন মণীষীদের বক্তব্য বেশ প্রণিধানযোগ্য। আমেরিকার ইতিহাসবিদ হেনরি এডামস শিক্ষকের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, “একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলেন, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়।” দার্শনিক বাট্রার্ন্ড রাসেল এ বিষয়ে বলেছেন, “শিক্ষক সমাজ হচ্ছেন প্রকৃত সমাজ ও সভ্যতার বিবেক। এ কারণেই শিক্ষকদের বলা হয় সমাজ নির্মাণের স্থপতি।” সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী লুনাচারস্কি বলেছিলেন, “শিক্ষক হলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি নতুন প্রজন্মের কাছে যুগ-যুগান্তরে সঞ্চিত যাবতীয় মূল্যবান সাফল্য হস্তরত করবেন, কিন্তু কুসংস্কার, দোষ ও অশুভকে ওদের হাতে তুলে দেবেন না।” ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন বলেছেন, “সমাজ পরিবতের্নর পূর্বশর্ত মানুষের পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের অভিভাবকত্ব শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব।” মনোবিজ্ঞানী কার্ল জং সুইস বলেন, “ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষকদের প্রতি লোকেরা সম্মানের দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকায় তাদের প্রতি, যারা আমাদের মানবিক অনুভূতিকে স্পর্শ করে।” উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড বলেন, “একজন সাধারণ শিক্ষক বক্তৃতা করেন, একজন ভাল শিক্ষক বিশ্লেষণ করেন, একজন উত্তম শিক্ষক প্রদর্শন করেন, একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন।”
ছাত্রজীবনে শিক্ষককে আদর্শ ও মহান ব্যক্তিত্ব হিসেবে অন্তরে লালন করেছি। সমাজে তাদের সম্মান বিরল তা নিজ চোখে দেখে মনে মনে সংকল্পে এঁটেছি বড় হয়ে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেব। তাই সকল লোভ লালসাকে পেছনে ফেলে সরকারি লোভনীয় চাকরির সকল যোগ্যতাকে ছাপিয়ে শিক্ষকতার ন্যায় মহান ব্রতে আত্ননিয়োগ করি। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, শিক্ষকতা পেশার সে মর্যাদা আজ আর নেই, বলা যায় একেবারেই তলানীতে। এ পেশায় ২৫ বছর অতিক্রান্ত করেছি, অনেক দেখেছি, বুঝেছি। শিক্ষকরা আজ নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। শিক্ষার্থী কিংবা সরকারি আমলা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এমনকি স্থানীয় হোমরা চোমরা কর্তৃক শিক্ষককে অপমান অপদস্ত করার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। শিক্ষকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গরিমসি খুবই বেদনাদায়ক।
দেশের ৯৮ ভাগ শিক্ষা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এবং শিক্ষকরা সুবিধাবঞ্চিত। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, সেবাব্রত নিয়ে এ মহান পেশায় যোগদান করলেও আর্থিক দীনতা ও প্রাপ্য সম্মান না পেয়ে পেশার স্বকীয়তা হারিয়ে অনেক শিক্ষকই অনৈতিক পথ অবলম্বন করছেন। মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতিরেকে অন্যান্য স্তরে শিক্ষকতা পেশা গ্রহণে মোটেও আগ্রহী নয়। দেশের মানুষ জানে এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন পায়। কিন্ত ক’জনাই বা জানে শিক্ষকরা বেতনের নামে শুধুমাত্র অনুদান পায়। আবার সে অনুদান থেকে ১০% কেটে নেয়া হয় কল্যাণট্রাস্ট ও অবসর তহবিলে। শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া মাত্র ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা এবং উৎসব ভাতা ২৫%। সন্তানের শিক্ষা ভাতা ও শ্রান্তি বিনোদন ভাতার কোন বালাই নেই। বদলি নেই, চাকরি যেখানে শুরু সেখানেই শেষ।
সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের প্রাপ্য সুবিধাদির মধ্যে বৈষম্য আকাশ-পাতাল। আমি বেসরকারি শিক্ষক হলেও সরকারি বিধি মোতাবেক নিয়োগপ্রাপ্ত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি এমপিওভূক্ত এবং বেতনের নামে লজ্জাস্কর অনুদানপ্রাপ্ত। আমার রাইফেল আছে গুলি নাই। আমি জাতীয় বেতন স্কেলের ৭ম গ্রেডের অন্তর্ভূক্ত হলেও আমার নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। আমার চাকরি স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মর্জির উপর নির্ভর করে। পান থেকে চুন খসলেই চাকরিচ্যুতি। তাই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেও শুধুমাত্র বেসরকারি উপাধির কারণে আমরা আজ নিগৃহিত। কিন্ত আমার বড় পরিচয় আমি শিক্ষক, মানুষ গড়ার কারিগর। আমি বেসরকারি শিক্ষক এ নহে মোর অপরাধ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে অত্যাচারী শাসকও নত শিরে গুরুর সামনে দাঁড়িয়েছেন। গুরুকে অসম্মানের দৃষ্টতা কেউ দেখাননি। চানক্য শ্লোকে আছে, “এক অক্ষরদাতা গুরুকেও যে গুরু বলিয়া মান্য করে না, সে শতবার কুকুরের যোনিতে জন্মগ্রহণ করিবে।”
শিক্ষা গুরুকে কীভাবে মর্যাদা দিতে হয় তা বাদশা আলমগীর বিশ্ববাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নিজের শিক্ষাগুরু জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানকে সম্মানিত করে এ গুণেধরা সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন শিক্ষকদের মর্যাদা সবার উপরে। তিনি কার্পেট মোড়ানো পথে নিজে না হেটে শিক্ষাগুরুকে ছেড়ে দিলেন, শিক্ষাগুরুর গায়ের চাদর নিজেই ঠিক করে দিলেন, এ এক অনন্য নজির। প্রত্যাশা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ অনন্য দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে জাতি শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় ব্রতী হবেন এবং শিক্ষকরাও তাদের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবেন।
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়,
মুরাদনগর, কুমিল্লা। ০১৮১৮৬৬৪০৩৪, E-mail:
alauddinhm71@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com