দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
সংবাদ শিরোনাম
জাতীয়করণ আমার অধিকার — মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার বর্তমান সংসদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কারাগারের রোজনামচা ও কাউয়া সমাচার সংগঠন যার যার জাতীয়করণ সবার।। প্রয়োজন লেজুরবৃত্তি পরিহার ভাগ্য সুপ্রসন্ন বর্তমান চেয়ারম্যান-মেম্বারদের জীবন-জীবিকা মখোমুখি! এ যেন শ্যাম রাখি না কুল রাখি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি শিক্ষকের মুখে হাসি নেই।। অনেকেই নিরবে চোখের জল ফেলছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করোনার থাবায় বিপর্যস্ত বেসরকারি শিক্ষকরা।। আপনার সুদৃষ্টি কামনা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভালো নেই মানুষ গড়ার কারিগর বেসরকারি শিক্ষকরা! বাশিস এবং নজরুল ইসলাম রনি জাতীয়করণ প্রশ্নে আপোষহীন
বৃহত্তর কুমিল্লার স্মরণীয় বরণীয়-নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী

বৃহত্তর কুমিল্লার স্মরণীয় বরণীয়-নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। নারী শিক্ষার অগ্রদুত ভারতবর্ষের একমাত্র মহিলা নবাব অসাধারণ প্রতিভার অধিকারিনী দুরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়নতার প্রতিভূ নবাব ফয়জুন্নেসা ১৮৩৪ সালে কুমিল্লা জেলার বর্তমান লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁওয়ে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী এবং মাতা আরফান্নেসা চৌধুরানী। তাঁর দু’ভাই এয়াকুব আলী চৌধুরী ও ইউছুফ আলী চৌধুরী এবং দু’বোন লতিফুন্নেসা চৌধুরানী ও আমিরুন্নেসা চৌধুরানী। দাদার নাম হোসেন আলী চৌধুরী এবং দাদী ময়মনা বিবি। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন মোঘল সম্রাটের বংশধর মীর্জা আগন খাঁন।

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না। সমসাময়িক জমিদার পরিবারগুলোতে মেয়েদের শিক্ষার বিষয়টি সাধারণত কোরআন শরীফ পাঠ, নামাজ-রোজা প্রভৃতি ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষালাভ, রন্ধনকার্য, সূচীকর্ম, অক্ষরজ্ঞানসহ পারিবারিক পর্যায়ে কিছু প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই নবাব ফয়জুন্নেসার জীবনেও কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ মেলেনি। তবে ফয়জুন্নেসা ছিলেন একটু ব্যতিক্রমী স্বভাবের। তিনি ছিলেন কুসংস্কারমুক্ত। শৈশবকালেই চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষা লাভের আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী মেয়েকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার মানসে গৃহ শিক্ষক নিযুক্ত করেন। জ্ঞান পিপাসু ফয়জুন্নেসা বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষা চর্চা করেন এবং সহজেই পারদর্শী হয়ে উঠেন।

অপরূপ রূপ ও গুণের অধিকারিণী ফয়জুন্নেসা বাউকসারের জমিদার মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর নজরে পড়েন এবং বিয়ের প্রস্তাব দিলে নাবালিকা অজুহাতে প্রত্যাখ্যাত হন। কিন্তু আশা ছাড়েননি মোহাম্মদ গাজী। নিঃসন্তান প্রথমা স্ত্রী নজমুন্নেসার সম্মতিতে অত্যন্ত সুকৌশলে ১৯৬০ সালে ফয়জুন্নেসার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৮৬০-১৮৭২ সালের মধ্যেই তাঁর গর্ভে জন্ম নেয় দু’কন্যা সন্তান আরশাদুন্নেসা ও বদরুন্নেসা। সতীনের কারসাজিতে অল্পদিনের মধ্যেই তাঁদের দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। স্বামী মোহাম্মদ গাজীর জমিদারী জেদের শিকার হয়ে ফয়জুন্নেসা শিশুকন্যা আরশাদুন্নেসাকে স্বামী গৃহে রেখে অপর কন্যা বদরুন্নেসাকে নিয়ে চলে আসেন মাতৃসান্যিধ্যে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় ফয়জুন্নেসা নীতি ও নৈতিক দৃঢ়তার কারণে অনাকাঙ্খিতভাবে দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটান।

ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন। স্বামীসঙ্গ ত্যাগ এবং স্বীয় কন্যাকে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করার দুঃখ প্রশমিত হওয়ার পূর্বেই তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। বড়ভাই ইয়াকুব আলী চৌধুরীর অপরিনামদর্শী আচরণ তথা গড্ডালিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়ার কারণে দুরদৃষ্টিসম্পন্ন ফয়জুন্নেসাকেই মায়ের রাজ্য শাসন ও প্রজাপালন করতে হয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর উপর জমিদারীর দায়িত্ব অর্পিত হয়। প্রশাসনিক দক্ষতা, জনহিতকর কাজে নিবেদিতপ্রাণ, শিক্ষানুরাগ, মানবিক সহায়তা, প্রজারঞ্জনে বিশেষ পারদশির্তার কারণে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন।

হোমনাবাদ পরগণার জমিদার হিসেবে অত্যন্ত তড়িৎকর্মা, প্রজাহিতৈষী, সমাজসেবিকা, শিক্ষানুরাগী ফয়জুন্নেসা নিজকে গড়ে তোলেন একজন বিচক্ষণ শাসকরূপে। সৃষ্টি করেন উন্নয়নের নবধারা। তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে, জমিদারীর ১৪টি মৌজায় ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মক্তব, দিঘি, পুকুর, রাস্তাঘাট, মুসাফিরখানা, হাসপাতাল ইত্যাদি নির্মাণ। নবাব ফয়জুন্নেসা উপমহাদেশে নারী জাগরণের অগ্রদুত ছিলেন। নারী শিক্ষা প্রসারে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তৎকালীন মুসলিম সমাজে শিক্ষা প্রসারে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর দানশীলতা ও শিক্ষানুরাগের অনন্য নিদর্শন কুমিল্লার বিখ্যাত বিদ্যানিকেতন ‘ফয়জুন্নেসা উচ্চ ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা। বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর পূর্বে ১৮৭৩ সালে তিনি এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এটিই ‘নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। তিনি পশ্চিমগাঁওয়ে একটি দশ গম্ভুজ বিশিষ্ট মসজিদ, একটি স্কুল এবং হাই মাদ্রাসা স্থাপন করেন যাহা বর্তমানে নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ। বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী রায় বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায় ভিক্টোরিয়া কলেজ স্থাপনকালে নবান ফয়জুন্নেসা দশ হাজার টাকা দান করেন। বাস্তবিকপক্ষে তিনি ছিলেন অন্ধকার যুগে আলোর দিশারী।

নবাব ফয়জুন্নেসা দানশীলতা ও সমাজসেবার জন্য অমর হয়ে আছেন। তৎকালীন ত্রিপুরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রজাদরদী ও সমাজহিতৈষী মি. ডগলাস জেলার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সুদুরপ্রসারী ও ব্যয়বহল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্রিটিশ সরকার থেকে না পাওয়ার সম্ভাবনা হেতু মি. ডগলাস জেলার জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নিকট ঋণ হিসেবে অর্থ সহায়তা চান। আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে তিনি যখন এ পরিকল্পনা পরিত্যাগ করার সিদ্বান্ত নেন ঠিক তেমনি সময় হোমনাবাদ পরগণার জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসার এক দুত এসে জানালেন, চিঠি মারফত যে পরিমান টাকা চাওয়া হয়েছে তার সবটাই তিনি পাঠিয়েছেন। তবে ঋণ হিসেবে নয়, জনগণের উপকারার্থে দান হিসেবে। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ মি. ডগলাস বিষয়টি মহারানী ভিক্টোরিয়াকে অবহিত করেন এবং সত্যিকার মানবতাবোধ সম্পন্ন এক মহান নারী হিসেবে তাঁকে ভারতীয়দের সর্বোচ্চ খেতাব নবাব শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ বেগম উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু নবাব ফয়জুন্নেসা বেগম উপাধি প্রত্যাখান করলে মহারানী ‍ভিক্টোরিয়া রাজ দরবারের উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে তাঁকে ১৮৮৯ সালে ‘নবাব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনিই ভারতবর্ষের একমাত্র মহিলা নবাব। তৎকালীন একজন মুসলিম নারীর এ অভূতপূর্ব সম্মান অর্জন সত্যিই বিষ্ময়কর।

দানশীলতার অপূর্ব নিদর্শন ও চির স্মরণীয় অবদান হচ্ছে নবাব ফয়জুন্নেসা কর্তৃক তাঁর বসতবাড়িসহ সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফকরণ। ১৮৯৩ সালে তিনি পর্দানশীল মেয়েদের জন্য কুমিল্লার চর্থায় প্রতিষ্ঠা করেন জেনানা হাসপাতাল। ১৯২৯ সালে তা সংযোজন করা হয় সদর হাসপাতালের সাথে ‘নবাব ফয়জুন্নেসা ফিমেল ওয়ার্ড’ নামে। সাহিত্যাঙ্গণেও নবাব ফয়জুন্নেসার অনন্য অবদান রয়েছে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে তিনিই প্রথম মহিলা কবি। তাঁর ‘রূপজালাল’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। এছাড়াও তিনি ‘সঙ্গীত লহরী’ ও ‘সঙ্গীতসার’ নামে দু’টি গীতিকাব্য রচনা করেন। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সুধাকর’ পত্রিকার তিনি অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং ‘মুসলমান বন্ধু’ পত্রিকায় এককালীন পাঁচশত টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। ১৮৯৪ সালে তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালনের জন্য পবিত্র মক্কা শরীফ গমন করেন। অসুস্থতাজনিত কারণে মেছফালা মহল্লায় এক বৎসর অবস্থান করে ১৯৯৫ সালে হজ্বব্রত সম্পন্ন করেন।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রজাদরদী ও সমাজহিতৈষী জমিদার শিক্ষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য ও নারী জাগরণের ক্ষেত্রে একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমাজ সংস্কারক, লেখক ও নবাব ফয়জুন্নেসা ইহলোক ত্যাগ করেন ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। আলোর দ্বীপ ফয়জুন্নেসার দ্বীপশিখা নিভে গেলেও আমাদের মাঝে রয়ে গেছে অনির্বান দ্বীপ তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ, মক্তব, মাদ্রাসা, মসজিদ আর অমর গ্রন্থ ‘রূপজালাল’। তিনি অমর তাঁরই কীর্তির মাঝে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com