দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
সংবাদ শিরোনাম
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া শিক্ষা জাতীয়করণ ‘সোনার পাথর বাটি’ পিতার স্বপ্ন ছিল শিক্ষা জাতীয়করণ কন্যার হাতে হোক বাস্তবায়ন হোমনায় ভ্রাম্যমান আদালতে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি এবং একাশির ১৭ মে বাঙালির ইতিহাসে দু’টি স্মরণীয় দিন হোমনায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধিকে গণধর্ষণের অভিযোগে আটক-৪ সমাজের দুর্গন্ধটুকু এখন আর কারো নাকে লাগেনা বাংলাদেশের বর্তমান শীতল রাজনীতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের শ্রেষ্ঠ সময় হোমনায় আওয়ামী যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত অতিক্রম করছে-শেখ হাসিনা ভারতের ‘প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার’ নীতিতে এক নম্বর পিলার হচ্ছে বাংলাদেশ-নরেন্দ্র মোদি
বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি এবং একাশির ১৭ মে বাঙালির ইতিহাসে দু’টি স্মরণীয় দিন

বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি এবং একাশির ১৭ মে বাঙালির ইতিহাসে দু’টি স্মরণীয় দিন

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি এবং একাশির ১৭ মে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১০ জানুয়ারি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার মহানায়ক বাঙালির প্রাণের স্পন্দন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন’মাস ব্যাপী পাকিস্তানি কারাগারে বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভের পর লন্ডন ও দিল্লী হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। ইতিহাসে দিনটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর্যন্ত জাতি বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে দিনটি পালন করে আসছে।
পঁচাত্তরের পনর আগস্ট বিদেশে অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা দীর্ঘ অর্ধযুগ পর একাশির ১৭ মে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। প্রতিবছর এদিনটি শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ফিরে পেয়ে বাঙালি যেন শেখ হাসিনার মাঝে তাদের প্রিয় নেতার সান্যিধ্য লাভে সক্ষম হয়েছেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, প্রবন্ধকার, কলাম লেখক ও গ্রন্থাকার ড. আনু মাহমুদ তাঁর ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা’ গ্রন্থে নির্বাসন সমাপন: বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন, অংশে লিখেছেন , ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক নিহত হবার মধ্যে দিয়ে বাংলার মানুষ যে বাংলাদেশকে হারায় সেই হারানো বাংলাদেশ আবার ফিরে এলো শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সাথে। সমগ্র বাংলা ভেঙ্গে পড়ল কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে। মানুষের প্রাণে জাগল নতুন জোয়ার। স্বস্তির এ জোয়ার এর পূর্বে বাংলার মানুষ আর একবার দেখেছে সেদিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি-জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে। বাংলার মানুষ আবার ফিরে পেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মহাশক্তি। শেখ মুজিবকে ফিরে পেয়ে বাংলার মানুষ স্বাধীনতার পূর্ণতা পেয়েছিল। তেমনি শেখ হাসিনাকে ফিরে পেয়েও বাংলার মানুষ ফিরে পেল তাদের হারানো বাংলাকে। রাষ্ট্রক্ষমতায় লে. জেনারেল জিয়া থাকলেও রাজপথ জনগণের দখলে চলে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে বঙ্গবন্ধু ও জয়বাংলা শ্লোগান নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৭ মে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে।”
একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দীর্ঘ ন’মাস ব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজির নেতৃত্বে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। ৩০ লক্ষ শহীদ ও দু’লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ মহান স্বাধীনতা। এ দিন বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা বীর বাঙালির হৃদয়ে তখনও বিষাদের ছায়া। কেননা যাঁর স্বপ্ন ও সারা জীবনের ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হলো আমাদের স্বাধীনতা; সেই প্রাণের সারথী সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, স্থপতি, রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তাঁকে ছাড়া বাঙালির বিজয়ের আনন্দ একেবারেই শ্রীহীন, ম্লান, অর্থহীন। তাই সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের আকুতি আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা স্বাধীনতার মহানায়ককে ফিরিয়ে দাও আমাদের মাঝে। অকুতভয় মুক্তিবাহিনী দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন, অনতিবিলম্বে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিয়ে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও, নইলে আমরা পাকিস্তানের দিকে লংমার্চ করবো; পাকিস্তানকে চিরতরে ধ্বংস করে দেব।”
বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ, মুক্তিযোদ্ধাদের দাবীর প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠলো। দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ, বীরমুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্ব-নেতৃবৃন্দের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে পাকিস্তান সরকার ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান সরকার সরাসরি বাংলাদেশে না পাঠিয়ে বিশেষ কমেট বিমানে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেন। ৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে ভারতের দিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারি প্রিয় মাতৃভূমি দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন এবং ২৩ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন।
দেশে ফেরার আগে দিল্লীতে মিত্র রাষ্ট্র ভারত সরকার বঙ্গবন্ধুকে বীরোচিত সংবর্ধনা প্রদান করেন। পালাম বিমানবন্দরে ভারতের তৎকলীন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, বিদেশী কুটনৈতিকবৃন্দ এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। তাঁদের সংবর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধু আবেগজড়িত কন্ঠে বলেন, “আমার দেশের মানুষের বিজয় উল্লাসে শামিল হতে আমি ছুটে যাচ্ছি কিন্তু অন্ধকার থেকে আলোকের পথে যাবার আগে ভারতভূমিতে দাঁড়িয়ে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেলাম ভারতের জনগণের প্রতি, অনন্যা, অসাধারণ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি, তাঁর সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের প্রতি। এদের সকলের প্রতিই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অপরিসীম কৃতজ্ঞতা।”
দিল্লীর প্যারেড গ্রাউন্ডে ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, পাক বাহিনীর আক্রমণে এক কোটি লোক মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। শতশত যুবককে, মা-বোনকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। কি চেয়েছিলাম আমরা? বাঁচার অধিকার চেয়েছিলাম। তার প্রতিদানে পেয়েছিলাম বন্ধুক, বুলেট, গুলি। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পর ভাই ভাই হয়ে বাস করবে শান্তিপূর্নভাবে।” বঙ্গবন্ধু ভারতবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সেনাবাহিনী, আপনাদের সাধারণ জনগণ যে সাহায্য ও সহানুভূতি আমার জনগণকে দেখিয়েছেন, চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না। আপনাদের নমষ্কার, আপনারা জানেন, দুদিন আগেও আমি পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে বন্দি ছিলাম। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী দুনিয়ার এমন কোন জায়গা নেই, আমাকে রক্ষার জন্য টেলিফোন করেননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষ তাঁর কাছে এবং তাঁর সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার দেশের এক কোটি লোককে যেভাবে খাওয়ার বন্দোবস্ত এবং থাকার ব্যবস্থা করেছেন, আমরা তা কখনই ভুলবো না, চিরদিন স্মরণ রাখব।” আসলে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি দিল্লী থেকে ঢাকা সর্বত্রই ছিল প্রাণের জোয়ার। সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথ, অলি-গলি সর্বত্রই হাজার হাজার মানুষ প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ফেস্টুন হাতে দলে দলে বঙ্গবন্ধুর নামে শ্লোগান দিতে দিতে জড়ো হতে থাকে রেইসকোর্স ময়দানের দিকে। আবার উৎসুক জনতার অনেকেই সরাসরি চলে যান বিমানবন্দরে। বেলা ১ টায় বঙ্গবন্ধু কে বহনকারী ব্রিটিশ বিমানটি যখন বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করে তখন জনতার ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। লক্ষ জনতার মুহুমুহু শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে আকাশ-বাতাস। একত্রিশবার তোপধ্বনি আর লাখো লাখো মানুষ তাদের আনন্দাশ্রুর মাধ্যমে বরণ করে নিল তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে।
বিমানের দরজা খোলার সাথে সাথে স্মিতহাস্যে বেড়িয়ে এসে দু’হাত নেড়ে বঙ্গবন্ধু সকলকে বিজয় অভিবাদন জানান। তোপধ্বনির পর বিউগলে বেজে উঠে জাতীয় সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনা। মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম অভ্যর্থনা জানাতে গেলে বঙ্গবন্ধু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, হায়রে স্বাধীনতা, তোর জন্যে আমার ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে বলি দিতে হলো।’ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে জড়িয়ে ধরে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মুখে কোন কথা বেরুচ্ছিলো না। ক্ষীণকন্ঠে বলে উঠলেন, আমার তাজ। এভাবে বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানিসহ সকল নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র ও যুবলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে কুশল বিনিময় শেষে তিনি রওয়ানা দেন রেইসকোর্স ময়দানের দিকে। যেখানে লক্ষ জনতা তাঁকে এক নজর দেখা এবং তাঁর কন্ঠে আশার বাণী শোনার অপেক্ষারত।
বিমানবন্দর থেকে রেইসকোর্স ময়দান মাত্র ৩০ মিনিটের পথ। কিন্তু জনতার বাধভাঙ্গা স্রোত ঠেলে এবং মানুষের উষ্ণ ভালোবাসার ফুলেল শুভেচ্ছার দেয়াল ভেদ করে রেইসকোর্স ময়দানে পৌঁছতে সময় লেগেছিল প্রায় আড়াই ঘন্টা। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন রেইসকোর্স ময়দানে এসে পৌঁছলেন, তখন জয়বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু গগণবিদারি শ্লোগানে কেঁপে উঠে পুরো এলাকা। আনুষ্ঠানিকভাবে সভা শুরুর আগেই হাজারো ফুলের মালায় ঢেকে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সারা শরীর। বঙ্গবন্ধু তখন আবেগে আপ্লুত হয়ে একপর্যায়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে অশ্রুসিক্ত নয়নে লক্ষ জনতার সামনে রেইসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দিয়েছিলেন নতুন প্রজন্মের জ্ঞাতার্থে তা এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হলো –
“আমি প্রথমে স্মরণ করি বাংলাদেশের যে অগণিত হিন্দু-মুসলমানের ওপর অত্যাচার হয়েছে তাদের। তাদের স্মৃতির জন্য প্রার্থনা করি, তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করি। আজ আমার বাংলা স্বাধীন। আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না। বাংলার মেয়েরা, মায়েরা, ছাত্র-কৃষক সবাই আমার দেশের মুক্তির জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার তুলনা নেই।
আমি কারাগারে বন্দি ছিলাম। আপনারা দেশকে মুক্ত করেছেন। আমি জানতাম বাংলাকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। কত লোক শহীদ হয়েছেন, জান দিয়েছেন তবু পিছু হটেননি। ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলা হয়েছে। প্রথম এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও এত লোক, এত নাগরিক মৃত্যুবরণ করেননি, শহীদ হননি। আমি জানতাম না আবার আপনাদের মধ্যে ফিরে আসতে পারবো। আমি ওদের বলেছিলাম, তোমরা আমাকে মারতে চাও, মেরে ফেল। শুধু আমার লাশটা বাংলাদেশে আমার বাঙালিদের কাছে ফিরিয়ে দিও।
আমি আজ মোবারকবাদ জানাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারতের জনগণকে। মোবারকবাদ জানাই সেনাবাহিনীকে। মোবারকবাদ জানাই রাশিয়া, ব্রিটেন, জার্মান এবং আমেরিকার জনসাধারণকে। এক কোটি লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শ্রীমতি গান্ধীর ভারত তাদের খাবার-দাবার দিয়েছিল, আশ্রয় দিয়েছিল। এত বড় মানবতা ভোলা যায় না। আজ বাংলাদেশ এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না, ষড়যন্ত্র করে লাভ নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে।
আমি এর আগে এই ময়দানের সভায় আপনাদের বলেছিলাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলুন। আমার সহকর্মীরা অক্ষরে অক্ষরে আমার নির্দেশ মেনে চলেছেন। কত লোক প্রাণ দিয়েছেন। আমার কত লোক পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যরা খুন করেছে। কত লোককে আর দেখতে পাব না। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় বড় ভালোবাসি। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন, আমার বাংলায় রাস্তা নেই, ঘাট নেই, খাবার নেই, আমার মানুষ গৃহহারা, খাদ্য নেই, আমার মানুষ পথের ভিখারি- তোমাদের সাহায্য চাই। আবার বলি, বাংলাদেশকে মেনে নাও রেকগনাইজ কর। এ স্বীকৃতি দিতেই হবে। না দিয়ে উপায় নেই। আমরা হারবো না।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলে গিয়েছেন, সাত কোটি সন্তনের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি’। কিন্তু বাঙালি দেখিয়ে দিল কবিগুরুর সে বাণী ভুল। স্বাধীনতার সংগ্রামে এত লোক আত্মাহুতি দিয়েছে, ত্যাগ স্বীকার করেছে, এমন নজির বাংলা ছাড়া দুনিয়ার ইতিহাসে আর কোথায় নেই। এত লোক আর কোথাও প্রাণ দেয় নাই। তাই আমি বলি, দাবায়ে রাখতে পারবা না।
আজ থেকে আমার হুকুম প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে তোমরা আমার ভাই, আমি তোমাদের ভাই। আমাদের এই স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। মা-বোন কাপড় না পায়, যুবকরা কাজ না পায়।
মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ তোমাদের সকলকে আমার মোবারকবাদ। তোমরা লড়েছো, গেরিলা হয়েছো, রক্ত দিয়েছো-রক্তদান বৃথা যায় না। দেশকে স্বাধীন করেছো। আজ থেকে বাংলায় যেন চুরি-ডাকাতি না হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের লোক বাংলার কথা বলে না। আমি বলি, তোমরা বাঙালি হয়ে যাও, কেউ তোমাদের গায়ে হাত তুলবে না। কিন্তু যারা দালালি করেছে, লোকের ঘরে ঢুকে হত্যা করেছো তাদের বিচার হবে। একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিকের মতো বিচার হয়ে এদের শাস্তি হোক। শান্তি বজায় রাখতে হবে। শান্তির জন্যই বাঙালি রক্ত দিয়েছে। তারা শান্তি বজায় রাখতেও জানে।
আপনারা আমাকে চেয়েছেন, আমি এসেছি। আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। কবর খোঁড়া হয়েছিল। জীবন দেবার জন্য প্রস্তÍত হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি মানুষ, আমি বাঙালি। আমি মুসলমান, মানুষ একবার মরে, দু’বার নয়। হাসতে হাসতে মরবো, তবু ওদের কাছে ক্ষমা চাইবো না। মরার আগেও বলে যাবো আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার মা। আমি মাথা নত করবো না। গ্রেফতারের পর তিন মাস ওরা আমাকে ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে ইন্টারোগেট (জিজ্ঞাসাবাদ) করেছে। কিন্তু মাথা নামাইনি। ধরা পড়ার আগে তাজউদ্দীনকে বলেছিলাম, আমি চললাম কাজ করে যেও। তখন জানতাম আর ফিরে আসবো না। তাজউদ্দীন এবং অন্য সহকর্মীদের আশীর্বাদ করি, কারণ, তোমরা ঠিকমতো কাজ করেছো। আজ আমি বক্তৃতা করতে পারছি না। নমো নমো নমঃ সুন্দরী মম জননী জন্মভূমি। সেই ভূমির মাটিতে পা দিয়ে আমি চোখের পানি রাখতে পারছি না। জানতাম না এই মাটিকে, জাতিকে এতো ভালোবাসি ভাবতেই পারছিলাম না। আবার আমি বাংলার মাটিতে ফিরে এসেছি। বাংলার মানুষ আজ স্বাধীন। সামনে আমাদের অনেক কাজ বাকি। যেখানে তারা রাস্তা ভেঙেছে নিজেরাই তা তৈরি কর একজনও ঘুষ খেয়ো না। মনে রেখ, আমি ক্ষমা করবো না।
পশ্চিম পাকিস্তানি ভাইদের বলি, তোমাদের বিরূদ্ধে কোনো ঘৃণা নেই। তোমরা আমাদের মা বোনদের ওপর অত্যাচার করেছ। ৩০ লাখ লোককে মেরেছো। তবু বলি তোমরা সুখে থাকো। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে সব শেষ। তোমাদের সঙ্গে আর না। তোমরা স্বাধীন থাক। আমরাও স্বাধীন থাকি। দুই স্বাধীন দেশের সঙ্গে পৃথিবীর অন্য দেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক থাকে তাই থাকবে। তবে যারা অন্যায় করেছে তাদের ক্ষমা নেই। কারণ তোমরা গ্রামের পর প্রাম পোড়ায়ে দিয়েছ। এমন কোনো গ্রাম নাই, এমন কোনো ফ্যামিলি নাই, আমার লোককে হত্যা কর নাই।
আমি অসুস্থ। কিছুদিন পরে আবার বক্তৃতা দিব। কাপুরুষ তোমরা বল মুসলমান। মনে রেখ, ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্র। ভারত তৃতীয়। পশ্চিম পাকিস্তান মুসলমানের সংখ্যায় চতুর্থ। তোমরা মুসলমান, মুসলমান মা-বোনদের রেপ’ করে?
জেনে রাখ, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রই আমাদের আদর্শ।
দিল্লীতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যারা জানতে চান তাদের খুলেই বলি-ইন্দিরা গান্ধীকে আমি জানি, শ্রদ্ধা করি। তিনি জওহরলাল নেহেরুর মেয়ে, মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তাঁরা দীর্ঘকাল দেশসেবা করেছেন। যেদিন আমি বলবো সেদিনই তিনি বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতের সৈন্য সরিয়ে নেবেন। কিছু কিছু সরিয়ে নিতে আরম্ভ করেছেন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে আমি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে এবং তাঁর সরকারকে মোবারকবাদ জানাই। পৃথিবীর এমন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নাই যার কাছে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগতভাবে বলেননি, আপনারা ইয়াহিয়াকে বলুন মুজিবকে ছেড়ে দিতে। এক কোটি লোক মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে স্থান নিয়েছিল। কত অসুস্থ শরণার্থী মারা গিয়েছে। ক্ষমা কর আমার ভাইয়েরা, ক্ষমা কর। পৃথিবীর বহু দেশ আছে যার মোট জনসংখ্যাই দশ বা পনেরো লক্ষ। আর এক কোটি মানব এই বাংলা থেকে শুধু গৃহহারা হয়েছিলেন। তবু বলি ভাইয়েরা, আইন-শৃঙ্খলা তোমাদের হাতে নিও না। মুক্তিবাহিনী যুবকরা তোমরা আমার প্রণাম নাও।
ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, কর্মচারী, হিন্দু, মুসলমান, ভারতীয় জওয়ান তোমাদের সকলকে ধন্যবাদ। যেসব পুলিশ, ইপিআর, যারা মা-বোন গৃহ সব ত্যাগ করে সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন, যাদের অনেকের মা-বোনকে ওরা ধরে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রেখেছিল তাদের সকলকে ধন্যবাদ। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, ভাত খাবে, সুখে থাকবে এই আমার জীবনের সাধ। এই আশীর্বাদ আমাকে করবেন। আপনারা প্রাণ দিয়েছিলেন। বলেছেন, মুজিব ভাই বলে দিয়েছেন দেশকে স্বাধীন কর, জান দাও, আপনারা জান দিয়েছেন। আল্লাাহ আছেন তাই আমি আপনাদের কাছে ফিরে এসেছি। আমি জানি, আমার সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে কি কষ্ট আপনারা করেছেন।
নয় মাস কোনো কাগজ পাই নাই। কারাগারে আমাকে জানতে দেয়া হয়নি এখানে কি কষ্ট, কি লাঞ্ছনা। আসার আগে ভূট্টো সাহেব আমাকে বলেছিলেন, শেখ সাব, দেখুন, দুই অংশে কোনো বাঁধন রাখা যায় কিনা , যদি সম্ভব হয়। আমি বললাম, ভূট্টো সাহেব, তোমরা সুখে থাকো। কিন্তু বাঁধন টুটে গেছে, আর না। তোমাদের সঙ্গে সব শেষ।
ভাইয়েরা আমার চার লক্ষ বাঙালি এখনো পশ্চিম পাকিস্তানে। আপনাদের অনুমতি নিয়ে একটি দাবি আমি রাখতে চাই-রাষ্ট্রসংঘ অথবা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা থেকে ইনকোয়ারি করতে হবে-কিভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের শোষণ করেছে। আমি রাষ্ট্রসংঘের আছে এই দাবি রাখতে চাই।
ভাইয়েরা আমার, জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই। সাবধান করে দিচ্ছি-কেউ সে চেষ্টা করো না। সেদিন এই ময়দানের সভায় বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি কর। আজ বলি-ঠিক থাকো, এক থাকো। স্বাধীন হয়েছি, স্বাধীনই থাকবো। ইনশাল্লাহ।
আজ আমি বক্তৃতা করতে পারছি না। আপনারা আমাকে দোয়া করুন। সবাই মিলে মোনাজাত করুন। ভারত-বাংলাদেশ ভাই ভাই। শহীদের স্মৃতি অমর হোক। জয় বাংলা।
সুত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি ও জীবনধারা (১৯২০-১৯৭৫), মাহবুবুল আলম
বাহাত্তরের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শেষ হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনারবাংলা বিনির্মাণের আন্দোলন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনে তাঁর প্রাণান্তকর চেষ্টা ইতিহাসে বিরল। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে জাতিকে উপহার দিলেন সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের একটি লিখিত সংবিধান। সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে আয়োজন করেন সাধারণ নির্বাচনের। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৯৩টি। তৎসত্ত্বেও সরকারের চলার পথ কুসমাস্তীর্ণ ছিল না। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বানানোর চেষ্টা চালাতে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ প্রমাণের জন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার ও আইন শৃংখলার অবনতিসহ নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা চালাতে থাকে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই বঙ্গবন্ধু তাঁর অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল দুরদর্শিতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান।
বঙ্গবন্ধুকে জীবিত রেখে পাকিস্তানি চিন্তাধারা বাস্তবায়ন বাংলার মাটিতে সম্ভব নয় একথা সহজেই অনুধাবন করতে পারে স্বাধীনতা বিরোধীচক্র। তাই তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র ও নীলনক্সা প্রণয়নে তৎপর হয়ে উঠে। সিংহ হৃদয়ের মানুষ বঙ্গবন্ধু এ ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পারলেও বিশ্বাস করেননি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কোন বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে না। কিন্তু তাঁর বিশ্বাসে চির ধরিয়ে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকচক্র তাদের লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়। কিছু বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিকের চক্রান্তে, পরাজিত পাকিস্তনি দোসরদের পরিকল্পনা এবং সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী উচ্চাভিলাসী সদস্যরা সেদিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বিদেশে থাকায় সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতাসীনরা মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগের ধ্বংস কামনা করেন। পঁচাত্তর থেকে একাশি সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বড় দুঃসময় ছিল। অনেকটা অস্তিত্বের লড়াই। ধ্বংসস্তুপ থেকে আওয়ামী লীগকে জাগ্রত করার মানসে শেখ হাসিনার অনুপুস্থিতিতে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দীর্ঘ ৬ বছর স্বেচ্ছায় নির্বাসনে থেকে দল ও দেশকে রক্ষার তাগিদে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। সেদিন পুরনাবৃত্তি ঘটে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারির। বঙ্গবন্ধুকে সাড়ে দশ বছর পূর্বে বীর বাঙালি যেভাবে বরণ করে নিয়েছিল, শেখ হাসিনাকেও একই কায়দায় বরণ করে নেয় স্বাধীনতাকামী শান্তিপ্রিয় জনগণ।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এবং ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে দু’টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। প্রথমটি পাকিস্তানের বন্দী দশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যাহা বাঙালি জাতির জন্য ছিল আনন্দের, উচ্ছ্বাসের। দ্বিতীয়টি ছিল বড় কষ্টের, বেদনার তবে গৌরবময়। প্রতিকুল পরিবেশে সামরিক ও স্বৈরশাসকদের ভ্রুকুটি এবং রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান। জনতার গগণবিদারী শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে। জয়বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম, মাগো তোমায় কথা দিলাম-মুজিব হত্যার বদলা নেব। শেখ হাসিনা আসছে- জিয়ার গদি কাঁপছে, গদি ধরে দিব টান-জিয়া হবে খান খান ইত্যাদি শ্লোগানের মাধ্যমে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে টুঙ্গি-তেজগাঁ, বনানী মায়ের কবর জিয়ারত শেষে মানিক মিয়া এভিনিউতে আয়োজিত বিশাল গণসংবর্ধনায় এসে যোগ দেন শেখ হাসিনা। তিনি বিমান থেকে নেমে প্রিয় মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করে বললেন, সব হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। সেদিন মানিক মিয়া এভিনিউর গণসংবর্ধনা ছিল আনন্দঘণ ও হৃদয়বিদারক। প্রিয় নেত্রীর আগমনে নেতা কর্মীদের মনে বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দের জোয়ার অপরদিকে স্বজনহারা নেত্রীর অশ্রুসিক্ত নয়ন এবং বুকভরা হাহাকার দেখে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা। বৈরী আবহাওয়া এবং সরকারের ইচ্ছাকৃত অসহযোগিতায় বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে লক্ষ লক্ষ জনতার মাঝে বক্তৃতার সময় শেখ হাসিনা বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সেদিন কান্না বিজরিত কন্ঠে তিনি বলেন, “আজকের গণসংবর্ধনায় লাখো মানুষের চোখ মুখ আমি দেখছি। শুধু নেই আমার বাবা, মা, ভাই-বোনসহ অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোন দিন ফিরে আসবে না, আপা বলে ডাকবে না। আপনারাই আজ আমার আপনজন। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত চার রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।”
লেখকঃ সম্পাদক, সাপ্তাহিক কালপুরুষ

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com