দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
বানভাসি মানুষের ঈদ আনন্দ

বানভাসি মানুষের ঈদ আনন্দ

মো.সাজ্জাদ হোসেন।। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের যেন নিত্যসঙ্গী। দিন মাস বছর চলে যায় ঋতু বদল হয় সময় চলে যায় কিন্তু বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ সব সময় লেগেই থাকে। বন্যা জলোচ্ছাসকে বইপুস্তকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ছোটবেলা থেকে আমরা বইপুস্তকে পড়ে এসেছি বন্যা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে সাধারণ মানুষের কিছুটা দুর্ভোগ হলেও কৃষিকাজের জন্য ব্যাপক সুবিধা হতো। বন্যার পানিতে ফসলের জমিতে পলি জমে। পলি মাটিতে ফসল ভালো হয়। বানের পানি কারও জন্য অভিশাপ আবার কারও জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু বর্তমানে বানের পানি আর মঙ্গল জনক কোনকিছু বয়ে নিয়ে আসেনা।বানের পানি এখন সবার জন্য অভিশাপ। এটার জন্য মানব সৃষ্ট কারণ মূলত দায়ী।
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এই তিনটি নদীর নাম। জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা। নদীমাতৃক দেশে ছোটবড় মিলিয়ে ষোলশোর অধিক নদীর অস্তিত্ব ছিল। কবিসাহিত্যিকদের কবিতা, গল্প, উপন্যাসে ইছামতি, গড়াই, ব্রহ্মপুত্রসহ অসংখ্য নদীর ইতিহাস সাহিত্যের প্রতিটি পাতায় শোভা পেয়েছে। লেখকের লেখনিতে রসদ যুগিয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেষ্টিত বহমান নদী। নদী খেকো একশ্রেণির মানুষ নদীর গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। দখল করে নিয়েছে বুড়িগঙ্গার মত অসংখ্য নদী। প্রতিটি জেলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অসংখ্য নদী। জেলার অস্তিত্ব ঠিকই আছে কিন্তু নদীর অস্তিত্ব আজ আর নেই। নদী দখল খালবিল পুকুর ভরাট করে সবুজের সমারহে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত বাংলাদেশ আজ বসবাসের অনুপযোগী। খালবিল, পুকুর ভরাট করে নষ্ট করা হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নদী খেকোরা নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। নদীর নাব্যতা সংকট এবং দুর্বল বাঁধের কারণে নদীর দুইকূল উপচে বন্যার পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। আবার পানি চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন না থাকার কারণে শুষ্ক মৌসুমে মরু ভূমির মত দেখা যায়।
একটা সময় নদীর পানি টইটুম্বর থাকার পরও বন্যার আলামত লক্ষ্য করা যেতনা। আর এখন আষাঢ় শ্রাবণ মাসেএ কটু বৃষ্টিতে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠ, ঘরবাড়িত লিয়ে গেছে। নিম্নআয়ের মানুষের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে ঠাঁই হয়েছে রাস্তার ধারে। গবাদি পশু, হাঁসমুরগি বানের পানিতে ভেসে গেছে। উজান থেকে নেমে আসা পানিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত করে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়ে আজ বেকার। প্রতি বছরের ন্যায় মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে বন্যা। ৮৮/৯৮ ন্যায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার বইপুস্তক বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে লাখলাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বানভাসি মানুষের বেঁচে থাকাটাই বড় কষ্টের। দেশে রউত্তর, দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলসহ অনেক জেলার মানুষ আজ পানিবন্দি।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আযহা সন্নিকটে। মুসলিম ধর্মবলম্বীদের লোভ লালসা ত্যাগ করে পশু কোরবানি করে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হওয়ার উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল আয্হা। করোনা মহামারিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় রোজগার একেবারে বন্ধ। পশু কোরবানি করার মত সামর্থ্য তাদের কোথায়। যারা সামর্থ্যবান তাদের জীবনেও নাভিশ্বাস উঠে গেছে। ছেলে মেয়ে নিয়ে ঈদের আনন্দ আজ নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। খেটে খাওয়া অসহায় দিনমজুরের পাশাপাশি বেতনহীন শিক্ষক কর্মচারিরা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোটাই অনেকের পরিবারে কঠিন। ঈদ আনন্দ আজ তাদের কাছে বিলাসিতা। রেল স্টেশান, লঞ্চঘাট, বাসটার্মিনাল কোথাও ঘরে ফেরা মানুষের চিরাচরিত ভিড় নেই। বাড়ি গিয়ে পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন করার মত অবস্থায় নেই সাধারণ মানুষ।
সরকারি,বে-সরকারি সাহায্য সহযোগীতাটাও অনেকের কাছে পৌঁছে না। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, আয় রোজগার বন্ধ। বাড়তি খাবার মজুদ নেই। যেটুকু ছিল সেটাও বানের পানিতে ভেসে গেছে। বন্যা পরবর্তী জীবন হবে আরও দুর্বিষহ। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ শোকে দেখা দিয়েছে শিশু ও বৃদ্ধের শরীরে। দুষ্টু প্রকৃতির মানুষের নিষ্ঠুরতার কারণে আজ বলি হচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। প্রকৃতির চরম প্রতিশোধে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে অসহায় নিম্নবিত্ত মানুষের। ঢাকা শহরের বস্তিবাসীদের জীবন কঠিন সংকটে। সরকারি, বেসরকারি, সমাজের দানবীর ব্যক্তি ও আর্ন্তজাতিক সাহায্য সহযোগীতা ছাড়া কোনভাবেই বন্যার ক্ষতিকাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়।
লেখকঃ প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান, লাউরফতেহপুর ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ কলেজ, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com