দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
বাঙালির হৃদয়ের শ্লেটে বঙ্গবন্ধু অমর অবিনশ্বর

বাঙালির হৃদয়ের শ্লেটে বঙ্গবন্ধু অমর অবিনশ্বর

ছবিঃ সংগৃহিত

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত-শোষক আর শোষিত। আমি শোষকের বিরূদ্ধে-শোষিতের পক্ষে। এ কালজয়ী উক্তির মাধ্যমে যিনি সারা বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত, নিপীড়িত- নির্যাতিত, লক্ষ- কোটি মানুষের মুক্তি ও আর্তমানবতার প্রতীক হিসেবে হৃদয়ের মনিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছিলেন, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা, কাঙ্খিত মানচিত্র, সবুজের বুকে লালবৃত্ত খচিত পতাকা, চিরায়ত গ্রাম বাংলার নৈসর্গিক প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য এর অপূর্ব নিদর্শন ধ্বনিত জাতীয় সঙ্গীত যাঁর সুদীর্ঘ ২৩ বছরের ত্যাগ-তিতীক্ষা, শৌর্য-বীর্য, সাহস-বিচক্ষণতা, দুরদর্শিতা ও আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল, যিনি বাঙালির মহাকাব্য ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ তথা স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণার মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিলেন, যিনি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটি দেশকে স্বল্পতম সময়ে পুনর্গঠিত করেছিলেন, অবশেষে সপরিবারে জীবন উৎসর্গ করে গোটা বাঙালি জাতিকে করে গেলেন চিরঋণী, তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার রূপকার ও স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। এ স্বর্ণখচিত দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্ম তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সায়রা বেগম দম্পতির ঘর আলো করে আসা তাদের তৃতীয় সন্তান খোকা একদিন হয়ে উঠলেন বাঙালির জিয়নকাঠির নায়ক।
বঙ্গবন্ধু বিশ্বনন্দিত এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ শেখ মুজিব এন্ট্রাস পাশ করার পূর্বেই নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন এবং কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালে এন্ট্রাস পাশের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং এক বছরের মধ্যেই মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। পরের বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ভাষা নিয়ে মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘট ডাকে। ধর্মঘট পালনকালে সহকর্মীদের সাথে গ্রেফতার হন মুজিব। শুরু হয় কারাজীবন। ছাত্র আন্দোলনের মুখে ১৫ মার্চ তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিরা তাদের দাবি আদায়ে ধর্মঘটের ডাক দিলে মুজিব এ দাবির প্রতি সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেন। কর্মচারিদের এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে ১৯৪৯ সালের ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে জরিমানা করে। এ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হন মুজিব। এভাবেই চলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শোষিত-বঞ্চিতদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। যারফলে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে একের পর এক করতে হয় কারাভোগ। পৃথিবীর আর কোন রাজনৈতিক নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক এত অধিক সংখ্যকবার কারাবরণ করেছেন এমন নজির দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। কারাবন্দি মুজিব এর যুগ্ম- সম্পাদক নির্বাচিত হন। জুলাই মাসে মুক্তি পেয়েই জড়িয়ে পড়েন খাদ্য সংকটের বিরূদ্ধে চলমান আন্দোলনে। সেপ্টেম্বরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে আবারও গ্রেফতার হন। গ্রেফতার থেকে যেন নিস্তার নেই। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর আগমন উপলক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূখা মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ায় ১৪ অক্টোবর তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। এবার প্রায় দু’বছর পাঁচ মাস জেলে কাটাতে হয়েছিল। এভাবে একের পর এক বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছিল শেখ মুজিবকে। ৫৪ বছর বয়সের জীবনের সিকিভাগ কেটেছে তার জেলেই। স্কুল জীবনে ব্রিটিশ আমলে ছাত্রাবস্থায় ৭ দিন কারাভোগ ছাড়া বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তার জেলে কাটে পাকিস্তান আমলে।
পাকিস্তানী স্বৈরশাসকরা শেখ মুজিবকে জেলখানায় আটকে রেখেও ভাষা আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের দাবিকে উপেক্ষা করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে বন্দি অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে রাজবন্দি মুক্তি দিবস এবং বাংলাকে রাষ্ট্রবাষা করার দাবি দিবস হিসেবে পালনের জন্য সংগ্রাম পরিষদের প্রতি আহবান জানান মুজিব। এ দাবিতে ১৪ ফেব্রুয়ারি জেলখানায় অনশন শুরু করেন তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজের মিছিলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার শহিদ হন। মুজিব জেলখানায় এর প্রতিবাধে টানা ১৭ দিন অনশন করেন।
১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদ নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটে পারাজিত করে বিজয় অর্জন করেন। উক্ত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৪৩টি আসনে জয়ী হয়। ১৫ মে শেখ মুজিব প্রদেশিক সরকারের কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। উল্লেখ্য যে, ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা বাতিল করে দেয়। ওই দিনই শেখ মুজিব করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে আসলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় ৬ মাস কারাভোগের পর ২৩ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান।
১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব পুনরায় গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৭ জুন আওয়ামী লীগ আহুত পল্টন ময়দানের এক জনসভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবি করে ২১ দফা দাবি ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগকে সকল ধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিলে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয় এবং শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পূনঃনির্বাচিত হন। সংগঠনকে সুসংগঠিত করতে ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলীয় সিদ্বান্ত মোতাবেক তিনি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেণারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১১ অক্টোবর মুজিবকে গ্রেফতার করে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করতে থাক আইয়ুব শাহী। প্রায় ১৪ মাস পর মুক্তি পেলেও জেলগেট থেকেই তাকে পনরায় গ্রেফতার করা হয়। কিন্ত কোনভাবেই মুজিবকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। জেল, জুলুম, হুলিয়া মুজিবকে আরও অপ্রতিরোধ্য ও অজেয় করে তুলে। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের এক সভায় মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশকে সভাপতি এবং শেখ মুজিবকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মুজিব ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের দাবি জোড়ালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য দেশব্যাপী গণসংযোগ শুরু করেন। গণজাগরণ ঠেকাতে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা তিন মাসের মধ্যে একবার দু’বার নয় মোট আটবার গ্রেফতার করে শেখ মুজিবকে। প্রতিহিংসার এখানেই শেষ নয়, ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাকে প্রধান আসামি করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। এ মামলায় আসামীদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভে ফুঁসে উঠে পূর্ববাংলা। ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি ৬ দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং আটককৃতদের মক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে যা গণআন্দোলনে পরিণত হয়। ১৪৪ ধারা ও কারফিউ ভঙ্গ, পুলিশ-ইপিআরের গুলি আর বহু হতাহতের মধ্য দিয়ে আন্দোলন গণঅভ্যূত্থানে রূপ নেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে আইয়ুব সরকার ১ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের আহবান জানান। ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার চাপের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে মুজিবসহ সকল আসামিকে মুক্তি দেয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এসময় তিনি ছাত্রসমাজের ১১ দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানান। ২৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপি-িতে আইয়ুব খানের গোল টেবিল বৈঠকে বলেন, গণঅসন্তোষ নিরসনে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন দেয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। পাকিস্তানী শাসকরা বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলে তিনি বৈঠক ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। অতঃপর ২৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হন।
১৯৭০ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দলকে সুসংগঠিতকরণে দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফর জোরদার করেন। শত প্রতিকুলতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সত্তরের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা এবং কুটকৌশল বাস্তবায়নে ১ মার্চ তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেন। ফলশ্রুতিতে সারা পূর্ববাংলায় প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আওয়ামী লীগ ২ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল পালন করে এবং বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। অবশেষে কাঙ্খিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন স্বাধীনতার অমোঘ বাণী ”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
বঙ্গবন্ধুর এ বজ্রকণ্ঠে কেঁপে উঠে পাকিস্তান সরকারের ভিত। তাদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। তাই তারা রণপ্রস্তÍতি গ্রহণের জন্য কালক্ষেপনের আলোচনা নাটক মঞ্চস্থ করে। ১৬ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার জন্য ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর আলোচনা চলে। ২৫ মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ইয়াহিয়া সন্ধ্যায় গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। আসলে আলোচনার নামে কালক্ষেপন করে রণপ্রস্তুতি গ্রহণই ছিল তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য। ২৫ মার্চ মধ্যরাতেই নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে একটি বার্তা চট্টগ্রামে পাঠাতে সক্ষম হন। এ বার্তায় তিনি বলেন, ”সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।” তিনি সবাইকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করার আহবান জানান। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বার্তাটি পাঠ করে শোনান। এরপর ২৭ মার্চ বাঙালি সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান ঘোষণাপত্রটি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে পুনরায় পাঠ করে শোনান। ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেন এবং তাকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। গঠন করা হয় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপুস্থিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্টপতির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধে বীর বাঙালি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে অর্জন করে এক অভূতপূর্ব বিজয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশকে সহায়তাকারী ভারতীয় মিত্র বাহিনী এবং বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমা-ের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। আমরা পেলাম সবুজের বুকে লালবৃত্ত খচিত পতাকা ও মানচিত্র, মুক্ত স্বদেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তথনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। মুজিববিহীন এ স্বাধীনতা যেন বাঙালির কাছে অর্থহীন। তাই বীরবাঙালি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে কখন আসবে সে মাহেন্দ্রক্ষণ। কখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখবেন। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নতিস্বীকার করে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে একটি কমেট বিমানে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দিল্লী হয়ে ঢাকায় পৌঁছলে তাকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়। দিনটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশপ্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে প্রতিবছর উদযাপিত হচ্ছে।
১৯৭০ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শেষ হয় বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন। শরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের আন্দোলন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনে তাঁর প্রাণান্তকর চেষ্টা ইতিহাসে বিরল। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে জাতিকে উপহার দেন সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের একটি লিখিত সংবিধান। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনে আয়োজন করেন সাধারণ নির্বাচনের। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও তৎকালীন পরিস্থিতিতে সরকারের চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বানানোর চেষ্টা চালাতে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ প্রমাণের জন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা অবনতিসহ নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টির মাধ্যমে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা চালাতে থাকে। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১৯৭৫ সালের ৬ জুন বঙ্গবন্ধু সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে একটি নতুন দল গঠন করেন।
কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্য দিয়ে ক্ষুধামুক্ত, শোষণহীন, ন্যায়ভিত্তিক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই কাজ শুরু করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কাঁদামাখা লুঙ্গি আর শার্ট পরে কৃষক যাতে ব্যাংকে ঢুকতে পারেন সেজন্যে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের বাইরেও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির ভাগ্য ফেরাতে গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্পঋণ সংস্থা। এছাড়া পাঁচশালা পরিকল্পনা, মিলকারখানা জাতীয়করণ, বিসিক ও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) প্রতিষ্ঠা, কৃষকের জমির খাজনা মওকুফ, সমবায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিআরডিবি’র কার্যক্রম বিস্তার ছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বঙ্গবন্ধুর এ সাফল্য স্বাধীনতাবিরোধীরা সহজভাবে মেনে নেয়নি। বঙ্গবন্ধুকে জীবিত রেখে পাকিস্তানি চিন্তাধারা বাস্তবায়ন বাংলার মাটিতে সম্ভব নয়, একথা সহজে অনুধাবন করতে পারে স্বাধীনতা বিরোধীচক্র। তাই তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র ও নীলনক্সা প্রণয়নে তৎপর হয়ে উঠে। সিংহ হৃদয়ের মানুষ বঙ্গবন্ধু এ ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পারলেও বিশ্বাস করেননি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কোন বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে না। কিন্তু তার এ বিশ্বাসে চির ধরিয়ে পঁচাত্তরের পনর আগস্ট ঘাতকচক্র তাদের লক্ষভেদ করতে সক্ষম হয়। কিছু বিশ্বাসঘাতক রাজনীতিকের চক্রান্ত, পরাজিত পাকিস্তানী দোসরদের পরিকল্পনা এবং সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী উচ্চাভিলাষী সদস্যরা পৈশাচিক কায়দায় গুলি করে সেদিন শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, একসঙ্গে তিন বাড়িতে হামলা করে মেতে উঠেছিল অদম্য রক্তপিপাসায়। নিষ্ঠুর কায়দায় একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, ভগ্নিপতি পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, আব্দুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্ণেল জামিলসহ কয়েক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারি।
পঁচাত্তরের পনর আগস্ট ঢাকা শহরটা রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞে সপরিাবারে জীবন দিতে হয়েছিল বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে। পাকিস্তানিরা বারবার যাঁর প্রাণহরণ করার পরিকল্পনা করেও তা বাস্তবায়ন করার সাহস করেনি সে কাজটি অনায়াসে এবং অতি নিষ্ঠুরভাবে সাধন করেছিল বঙ্গসন্তানেরা। যে তর্জনী উচিয়ে একদিন বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” ঘাতকের গুলি সেই তর্জনী ছিন্নভিন্ন করেছিল। সাহসবিস্তৃত বক্ষপট বিদীর্ণ হয়েছিল বুলেটের আঘাতে। তাঁর দীর্ঘদেহ লুটিয়ে পড়েছিল বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের কালের সাক্ষী ৩২ নম্বরের সেই বিখ্যাত বাড়ির ভেতরের সিঁড়ির ওপর।
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ধারক, স্বাধীন বাংলাদেশের শ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। সেদিন পদদলিত হয়েছে বিশ্বমানবতা। হত্যাকারীরা হয়তো থমকে যায়নি, লজ্জিতও হয়নি। কিন্তু সেদিন কেবল বাঙালিই নয়, কেঁদেছে বিশ্বের শান্তিকামী লক্ষকোটি মানুষ। কারণ মুক্তিকামী মানুষ হারিয়েছিল তাদের প্রিয় নেতাকে। বঙ্গবন্ধু কেবল বাঙালির মাথার তাজ ছিলেন না, তিনি ছিলেন গোটা বিশ্বের ভূখা-নাঙ্গা মানুষের প্রতিনিধি। যে কারণে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের সামনে উচ্চস্বরে বলতে পেরেছেন, ”বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত। আমি শোষকের বিরূদ্ধে, শোষিতের পক্ষে।” সেদিনই বিশ্ব দরবারে বঙ্গবন্ধুর স্থান নির্ধারিত হয়ে গেছে।
ইতিহাসের নিরিখে দেখলে বঙ্গবন্ধু হত্যা কোন সরকার উৎখাতের লক্ষমাত্র ছিল না। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাষ্ট্রটির চরিত্র বদলের নীলনক্সার হত্যাকাণ্ড। সেজন্যই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান ও তার মিত্রদের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দেখি আমরা। দেখি জিন্দাবাদ আবার ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ বেতার ’রেডিও বাংলাদেশ’ হয়ে গেছে ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের পরপরই। রেডিও পাকিস্তান আদলে সবকিছু দ্রুত বদলে যেতে লাগলো। সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে গেল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।
ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। বাঙালির হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ভোলা যাবে না, ভোলা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা যায়নি, আর কোনদিন হত্যা করা যাবে না। জাতির পিতাকে কখনও হত্যা করা যায় না। জাতির পিতার অস্তিত্ব জাতিসত্ত্বার রসায়নে দ্রবীভূত হয়ে আছে। জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় এবং অমোচনীয় ইতিহাস দুই পঙক্তিতে অতি সংক্ষিপ্ত আকারে লিখতে হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা লিখতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই এবং জাতির জীবনে বঙ্গবন্ধু এক বিকল্পরহিত চেতনা। এ অনিবার্য চেতনা থেকে দুরে সরে যাওয়ার সরল অর্থ হবে জাতিসত্ত্বাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতাযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতাই ছিলেন না, একাত্তরের মহান বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি এশিয়া মহাদেশ তথা গোটা বিশ্বের রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছেও একজন স্বাধীনতা ও মুক্তির দুত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। গান্ধী, নেহেরু, টিটু, নাসের, চৌ এন লাই এর পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই ছিলেন এশিয়া তথা বিশ্বের নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের আলোর দিশা। তাঁর ঐতিহাসিক উত্থানই ঘটেছিল যেন মুক্তির দুত হিসেবে। কিন্তু তাঁর সে আন্তর্জাতিক উদীয়মান ভাবমূর্তি বেশিদুর এগুতে দেয়নি বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী ও ষড়যন্ত্রকারীরা। উত্থান ও যাত্রাপথের প্রাথমিক সোপানেই তাঁকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়। আর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের মধ্য দিয়েই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রাণাধিকার প্রতিষ্ঠার জয়যাত্রা সর্বোপরি দেশের অগণিত দুঃখি মানুষের আশা-ভরসা সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে যার রেশ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।
ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, খুনিদের রক্ষায় প্রাণান্তকর চেষ্টাও চালাতে থাকে দীর্ঘ ৩৪টি বছর। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ব্যতিত সকল ক্ষমতাসীনরাই খুনিদের রক্ষা ও পূনর্বাসনে তৎপর ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে এবং ডিয়াউর রহমান ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে বৈধতা দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এবং দেশবাসীর কাছে আজ স্পষ্ট যে, মোশতাক-জিয়া-এরশাদ-খালেদা সরকার খুনিদের পুনর্বাসন, পুরস্কৃতকরণ এবং বিচার প্রক্রিয়া প্রলম্বিত করতে হেন কোন পন্থা নেই যা তারা করেনি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে জাতির পিতার হত্যার বিচারে মামলা দায়ের হয়েছে ২১ বছর পর এবং বিচার সম্পন্ন হয়েছে ১৩ বছরে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় শত প্রতিকুলতা জয় করে অবশেষে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামালার চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার চোখে বহমান নিরন্তর শোকের নদীতে কয়েক ফোঁটা আনন্দের জল বইয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এ রায়। অগণিত সাধারণ মানুষকে করেছে আবেগাপ্লুত। জাতিকে দিয়েছে কলঙ্কমোচন ও পাপস্খলনের সুযোগ। এ রায় না ঘোষিত হলেও ঘরে ঘরে চর্যার টোটেম হয়েই থাকতেন মুজিব। তারপরও বলতেই হয়-বহুল প্রত্যাশিত এ রায় হায়েনাবিনাশী রায়। এ রায় হায়ানাদের বিরূদ্ধে গেছে। মহান নেতার প্রয়াণদিনে যারা নারকীয় উল্লাসে কেক কেটে নকল জন্মদিন পালন করে এসেছেন, এ রায় তাদেরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাড়ে না। ’পেটের মধ্যে দু’কলম বিদ্যা হয়েছে’ বলে আমরা যারা মানুষে মানুষে বৈষম্যকে প্রশ্রয় দিয়ে আসছি বছরের পর বছর, আমাদের মনের হায়ানাকে বিনাশ করতে না পারলে এ রায় তাদেরও বিরূদ্ধ যাবে। ভুললে চলবে না- একাত্তরে ওই হায়েনাদের পরাস্ত করার পরও পঁচাত্তরে দলবেঁধে ফিরে এসেছিল তারা। মনের হায়ানাকে তাড়াতে না পারলে বনের হায়ানারা ফিরে ফিরে আসে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোর এসেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের দম্ভোক্তি আর নিষ্ঠুর উল্লাসের বার্তা নিয়ে। এর ৩৪ বছর ৫ মাস ১৩ দিন পরের সকালটি আসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ওই কালরাতের উম্মত্ত ঘাতকদের মধ্যে পাঁচ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের সুসংবাদ নিয়ে। জাতির কলঙ্কমুক্তির রাঙা প্রভাতের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল সেদিন ’শেখ মুজিবের বাংলাদেশ’।
ইতিহাস আজ নিজের প্রয়োজনেই অজেয় শক্তি নিয়ে মূর্তিমান। যে নরঘাতকরা বাংলাদেশের স্থপতি ও লাখো শহীদের আত্মত্যাগকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পঁচাত্তরে রক্তপাত ঘটিয়েছিল, যারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছিল পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার অপরাধে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বাভাবিক গতিপথ রূদ্ধ করতে, সেই নরঘাতকদের ছয় জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের মাধ্যমে জাতি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
ইতিহাস বিকৃতকারীরা পরাস্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় বাঙালির হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে।। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ মানেই শেখ মুজিব। শেখ মুজিব মানেই বাংলাদেশ। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার ভাগ্যাকাশে যে দুর্যোগের ঘনঘটা শুরু হয় সেদিন থেকেই বাঙালি ব্রিটিশ এবং পরবর্তিতে পাকিস্তানিদের গোলামির জিঞ্জিরে বন্দি হয়। এ বন্দিদশা থেকে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের নায়ক, অগ্রদুত, যুগশ্রষ্টা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারকবাহক এবং উজ্জীবক মুজিব লাখো বাঙালির পরম পুজনীয়। মুজিব হত্যা কেবল একটি পরিবারের হত্যা নয়, এটি একটি দর্শন, আদর্শ এবং বিশ্বাসের উপর আঘাত, রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক চরিত্রের উপর আঘাত।
ইতিহাস বিকৃতির ঝা-া নিয়ে যারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, চিন্তাচেতনা ও আদর্শের মৃত্যু কামনা করেছিল, মুছে দিতে চেয়েছিল তাঁর নাম নিশানা, তাদের এ চাওয়া পাওয়া ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ টিকে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হবে ঘরে ঘরে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ স্বাধীনতার স্থপতি জীবিত বঙ্গবন্দুর চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী এখন লোকান্তরের বঙ্গবন্ধু। যততিন শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বেঁচে থাকবেন সব মুক্তিকামী মানুষের অন্তরে। বাঙালির হৃদয়ের শ্লেটে বঙ্গবন্ধু অমর অবিনশ্বর।
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর, কুমিল্লা। ০১৮১৮৬৬৪০৩৪, E-mail:alauddinhm71@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com