দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
সংবাদ শিরোনাম
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া শিক্ষা জাতীয়করণ ‘সোনার পাথর বাটি’ পিতার স্বপ্ন ছিল শিক্ষা জাতীয়করণ কন্যার হাতে হোক বাস্তবায়ন হোমনায় ভ্রাম্যমান আদালতে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি এবং একাশির ১৭ মে বাঙালির ইতিহাসে দু’টি স্মরণীয় দিন হোমনায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধিকে গণধর্ষণের অভিযোগে আটক-৪ সমাজের দুর্গন্ধটুকু এখন আর কারো নাকে লাগেনা বাংলাদেশের বর্তমান শীতল রাজনীতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষই শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের শ্রেষ্ঠ সময় হোমনায় আওয়ামী যুবলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত অতিক্রম করছে-শেখ হাসিনা ভারতের ‘প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার’ নীতিতে এক নম্বর পিলার হচ্ছে বাংলাদেশ-নরেন্দ্র মোদি
বাংলাদেশের বর্তমান শীতল রাজনীতি

বাংলাদেশের বর্তমান শীতল রাজনীতি

ছবিঃ মো’ মাহবুবুল আলম

মাহবুবুল আলম।। একদিকে করোনা অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি ও নানাবিদ কারণে রাজনীতিতে একটা শীতল অবস্থা বিরাজ করছে। সরকারী দল আওয়ামী লীগ দল হিসেবে সরকারের মধ্যেই বিলীন হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের ত্যাগী ও দুর্দিনের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন। এই কারণেই দলেরর চেইন অব কমান্ড অনেকটাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই সুযোগে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ‘চাটারদল’ (বঙ্গবন্ধু দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণীকে চাটারদল বলে ডাকতেন) তারা কখনো দলের কোনো কাজে আসে না; দলের সম্পদতো নয়ই বরং বোঝা কিন্তু সময় ও সুযোগ মতো গাছেরটা ও তলারটাও খায়। এরা অনেকটাই পরগাছা, পরজীবী বা শোষক মাছির মতো গাছের বা প্রাণীর সব সুসম খাবার বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তশুষে আশ্রয়গ্রহণকারী গাছ বা প্রাণীকেই নির্জীব ও রুগ্ন করে তোলে। সে রকম এখন আওয়ামী লীগের ঘাপটি মেরে থাকা ‘চাটারদল’ বা সুযোগ সন্ধানী বা ওয়ান টাইমার যে নামেই ডাকি না কেন তারাই এখন দলের ফন্ট বেঞ্চার আর দুর্দিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা বেকবেঞ্চার হিসেবে দল যে হেলে পড়ছে অসহায়ভাবে তা দেখছে। দলের ভেতর এই সুযোগ সন্ধানী ‘চাটারদল’ দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতার পদ-পদবী ও পেশীশক্তির দাপট দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি, টেন্ডারবাজি, দখল, চাঁদাবাজি, গুম অপহরণসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। আর দলের এই দুর্বলতার সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে তৃতীয় পক্ষ।আর দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বিব্রত। দলীয় শৃংখলার অভাবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বস্তরে দলের কোথাও যেন ন্যূনতম জবাবদিহিতা নেই। কেন্দ্র থেকে সংগঠনের যথাযথ তদারকী না থাকায় কেন্দ্রের নির্দেশও উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন কোনো কোনো এলাকার তৃণমূল নেতারা ।

এই অবস্থায় দলের ভেতর জবাবদিহিতার অভাবে সংগঠনের প্রতিটি পর্যায়ে এক একজন দলের ভেতর গ্রুপ সৃষ্টি করে দলের বারটা বাজাচ্ছে। এরাই হলো এখন ঘরের শত্রু বিভীষণ। সারাদেশেই এখন যেন আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগই। তার ওপর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো বিভিন্ন দল থেকে বিশেষ করে জামায়াত-শিবির থেকে আওয়ামী লীগে মাঝে মাঝেই যোগদানের খবর শিরেনাম হচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগের মতো দেশের সর্ববৃহত দলের নেতাকর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা যাচ্ছেনা সেখানে দলে নতুন যোগদানকারী ‘চাটারদলের’ সদস্যদের কিভাবে প্রোভাইড করবে? আওয়ামী লীগ কি এতটাই হীনবল হয়ে পড়েছে যে, জামায়াত-শিবিরের মতো একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক দলের নেতাকর্মীদের দলে ভিড়িয়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে হবে? এ প্রশ্নের জবাব কারো জানা নেই। এ নিয়েও দলের মধ্যে তীব্রভাবে অসন্তোষ বিরাজ করছে।সারাদেশে দলটির মধ্যে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দ্বন্দ্ব-বিবাদের সুযোগ নিয়ে তৃতীয়পক্ষ সরকারকে বিব্রত ও জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলার চেষ্টা করলেও টনক নড়ছে না সরকারী দল আওয়ামী লীগের। দলের মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব আর কাদা ছোড়াছুড়িতে কোন্দলের কারণে সরকারের সব অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। দলীয় রাজনীতি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

নির্বাচন উপলক্ষে রাজনীতির মাঠে একাধিক জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও ভোটের পর তাতে চলছে ভাটার টান। ভোটযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐক্যে বাজছে অনৈক্যের সুর। জোটের শরিকদের মধ্যে চলছে টানাপোড়েন। এদের কেউ কেউ ফের একসঙ্গে পথচলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্র্রশ্ন তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত কারণে ঐক্য হয়নি। স্বার্থগত কারণে ঐক্য হয়েছে। ভোটযুদ্ধে জয়লাভের স্বার্থে এক দল অন্য দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এক্ষেত্রে যেহেতু স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে, কাজেই ভোটে হেরে যাওয়ার পর বিরোধী জোটগুলোর মধ্যে হতাশা কাজ করছে বেশি। কারণ তাদের স্বার্থ উদ্ধার হয়নি, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। অন্যদিকে শাসক দলের সঙ্গে যারা জোট বেঁধেছিলেন, তাদের অনেকেরই স্বার্থহানি ঘটেছে। শরিক দলের অনেক নেতার প্রত্যাশা ছিল সরকারের অংশ হবেন। কিন্তু তাদের ভাগ্য ফেরেনি। এসব কারণে এ শিবিরেও তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। হতাশা থেকেই মূলত উভয়পক্ষের জোটভুক্ত দলগুলো ক্রমশ উৎসাহ হারাচ্ছে। এতেই দিনে দিনে জোটের রাজনীতিতে ভাটার টান স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দেশের দুই বড় দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি অনেকদিন ধরেই জোটগতভাবে পথ চলছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছে ১৪ দলীয় জোট। অন্যদিকে বিএনপির আছে ২০ দলীয় জোট। এর পাশাপাশি গত সাধারণ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেও বিএনপি আলাদা জোট করে। একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৪ দলের। টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় এই জোট। কিন্তু এবারই প্রথম জোটের শরিকরা কেউ সরকারে নেই। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ আওয়ামী লীগের শরিক দলগুলোর নেতারা। প্রকাশ্যেই তারা এ ইস্যুতে ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। অনেকে জোটগতভাবে পথচলা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
আর নেতৃত্বের সংকটে প্রধান বিরোধীদল বিএনপিতে চলছে অস্থিরতা। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও চরম সমন্বয়হীনতা কাজ করছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটি বা সিনিয়র নেতৃত্ব কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। মেয়াদোত্তীর্ণ ৫০২ সদস্যের ঢাউস নির্বাহী কমিটিও প্রায় অকার্যকর। গুটিকয় নেতাই দলের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তৃণমূলে একাধিক কমিটি গঠনেও দায়িত্বশীল নেতারা জানেন না। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে হুমকি-ধমকির মুখে পড়েন তারা। নেতাদের অনেকেই হতাশায় নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। প্রবীণ ও তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি করে দলের একটি ক্ষুদ্র অংশ বিএনপিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

এ সংকটের জেরেই সম্প্রতি দলের সিনিয়র দুই নেতাকে ‘শোকজ’ করা হয়েছে। সম্প্রতি শোকজ করা দুই ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না দল। এজন্য এই দুই নেতাকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের জাতীয় একাধিক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন কোনো আশার আলো দেখাতে না পারায় হতাশায় জর্জরিত তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও হতাশায়। থমকে আছে দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনও। সর্বশেষ দলের দুই সিনিয়র নেতাকে শোকজ ইস্যুতেও বিএনপিতে অস্বস্তি বিরাজ করছে। দলের স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশই এ মুহূর্তে এই শোকজের বিপক্ষে।

ক্ষমতার বাইরে থেকেও ক্ষোভ-বিক্ষোভের জালে আটকে আছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকরা। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে একসঙ্গে পথচলা নিয়ে তাদের মধ্যে টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের।একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হিসেবে জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াত, এলডিপি ও কল্যাণ পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিএনপির টানাপড়েন চরমে। দীর্ঘদিন ধরে জোটের বৈঠকও হচ্ছে না। নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে এ দলগুলোকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে বিএনপি। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক। সেখানে বিএনপির দুই নেতার শোকজ ইস্যুসহ চলমান রাজনীতি নিয়ে কথা হলেও কোনো অগ্রগতি নেই। সরকারের নির্বাহী আদেশে বাসভবনে অবস্থান করলেও দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখনো কারাবন্দী। বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কী তৃণমূল জানে না। কোন পথে এগোবে বিএনপি, তাও অজানা। মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের হতাশা কাটাতে কেন্দ্রের নেই কোনো কর্মসূচি। প্রায় তিন বছর ধরে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন নিয়েও কোনো ভাবনা নেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি জেলা বিএনপির কমিটিতে আহ্বায়ক কমিটি হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। অঙ্গ সংগঠনগুলোও এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে এসব সংকট কাটাতে হবে।
কিছুদিন আগে বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান, বিএনপির বর্তমান রাজনীতি নিয়ে “বিএনপি যেন পথহারা খোঁড়া ঘোড়া” শিরোনামের কলামে বিশদ আলোচনা করেছেন- তিনি সেখানে যা যা বলেছিলেন তার অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো: ‘ …বার্ধক্যপীড়িত দিগ্ভ্রান্ত মুমূর্ষু এক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে বিএনপি। নেতারা জানেন না কী হচ্ছে কী করবেন। কর্মীরা জানেন না তাদের কী করতে হবে। নেতারা কী বার্তা দেবেন? সব ঝিমিয়ে গেছে। কৌশল কী কর্মীরাও জানেন না। সিনিয়র নেতারা খালেদা জিয়াকে নেতা মানলেও তারেকে নারাজ। এটা বলারও সাহস নেই। তাই যে বার্তাই আসে কবুল করেন। এককালের জনপ্রিয় দাপুটে চমক সৃষ্টি করা টগবগে তারুণ্যের শাসক দল বিএনপি একদম খোঁড়া ঘোড়া। ’৭৫-উত্তর আওয়ামী লীগ চরম দুঃসময়েও দলকে গুছিয়েছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মী কারাগারে। নির্বাসনে। তবে কি বিএনপি ক্ষমতার দল বিরোধী দলে অযোগ্য? কিন্তু সেনাশাসন-বিরোধী সংগ্রামে ছাত্রদলের শক্তিতেই খালেদা জিয়া তো নেতৃত্বেই উঠে আসেননি ক্ষমতায়ও এসেছিলেন। ছাত্রদল এখন শিক্ষাঙ্গনে মুছে যাওয়া নাম। তাহলে বিএনপির এ করুণ দশা কেন! আইসিইউতে দল চলে গেছ’…

… বিগত নির্বাচনের পর কি একটি অর্থবহ বর্ধিত সভা করেছে। চুলচেরা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, খালেদা জিয়া কীসের আপসহীন। আপস না করলে উনি জেল থেকে বেরোলেন ক্যামনে। সরকারের কথা শুনেই তো বেরিয়ে এসেছেন। তিনি খালেদা জিয়ার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, বেগম জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন তার একটাই কারণ, তিনি জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী। অথচ সেই জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের বিচার করলেন না কেন? শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কিছুদিন আগে বলেছিলেন, জীবনে আর কোনো দিন মিথ্যা কথা বলবেন না। কারণ মিথ্যা বলে লাভ কী? মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা নেতা-কর্মীরা সরকারের সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। এ কারণে বেগম জিয়া জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু জনমনে তাঁর যে স্থায়ী আসন তার কোনো রিপ্লেসমেন্ট নেই। খালেদা জিয়াই বিএনপির বর্তমান ও ভবিষ্যতের একমাত্র নেতা। তাঁর পরে কে জানি না। ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর বলেন, তারেক রহমান দল কতটুকু চালাতে পারবেন আপনারাও দেখেন আমিও দেখি। লন্ডনে বসে কথাবার্তা-ভাব আদান-প্রদান করা কঠিন। তিনি খোমেনি নন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথেই আছেন। তাঁর এখন দলের চিফ অ্যাডভাইজার হওয়া উচিত। তিনি জেল থেকে কীভাবে মুক্তি পেলেন জানি না। তাঁর উচিত ছিল জেলে ফেরত যাওয়া। তাঁকে এক জেলখানা থেকে বের করে বাসার জেলখানায় ঢোকানো হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির কর্তৃত্ব বলে কিছু নেই। সমাজে প্রভাব থাকলেও দলে অলঙ্কার মাত্র। কর্তৃত্বহীন নেতারা জানেন না খালেদা জিয়ার মুক্তি কীভাবে হলো। পরিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এটুকু আদায় করেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে জোট করে ভোট করলেও পেছন দরজায় জামায়াতকে সঙ্গী করে ৪০টি আসন লাভের সুযোগও হাতছাড়া করেছে। জামায়াত প্রশ্নে দেশে একা, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিএনপি মিত্রহীন। একসময় যাদের প্রতি আশা রাখত গায়েবি কিছু ঘটিয়ে দেবেন আর বিএনপি সেখানে জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে সে আশার আলো নিভে গেছে। তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে হারিয়েছিল অনেক আগেই। সেই চীন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হয়েও উন্নয়নের কূটনীতিতে এখন শেখ হাসিনার আঁচলেই বাঁধা পড়েছে।

এর প্রভাব পড়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই জোটেও। ২০-দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির টানাপোড়েন চলছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে এখন আস্থার সংকট চরমে। শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কেউ কাউকে বিশ্বাস করছেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোটের আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে শরিক দলগুলোকে বিএনপির উপেক্ষার বিষয়টিও। এছাড়া ২০ দলীয় জোটকে গুরুত্বহীন করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপি। নবগঠিত এই জোটকে বেশি প্রধান্য দেয়া নিয়েও ২০ দলের শরিকদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। যার রেশ এখনও আছে। এত গুরুত্ব দেয়ার পরও জামায়াত ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিএনপির টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। সরকারবিরোধী শিবিরে শক্তি বাড়াতে ভোটের আগে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামসহ চারটি রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে আলাদা আরও একটি জোট গঠন করে। ভোটের আগে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বসে ছিল না অন্যরাও। যেটি এখন দৃশ্যত অকার্যকর।
সংসদের বিরোধীদল জাতীয় পার্টির রাজনীতেও চলছে অন্তর্গত অন্তদ্বন্ধ।তাদের রাজনীতির যেন কোনো রাজনীতিতে নিজস্বতা নেই। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসাইস মুহম্মদ এরশাদের পরলোকগমনের পর, দলের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে নানা উপদল। একদিকে এরশাদের বিধবাপত্নী রওশন এরশাদ অন্যদিকে ভাই জিএম কাদেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন আর অপ্রকাশ্য নয়। এমন এক উপদলীয় কোন্দলেই সম্প্রতি জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন চলচ্চিত্র অভিনেতা মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)। গত ১০ অক্টোবর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বরাবর রেজিস্ট্রার্ড ডাকযোগে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।সোহেল রানার জাতীয় পার্টি ছাড়ার খবর জানার পর জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে—কেন তিনি হঠাৎ করে এই দল থেকে পদত্যাগ করলেন। তিনি সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলাপকালে বলেন,‘ দলটির সাংগঠনিক বহু দুর্বলতা আছে যা আমাকে চরমভাবে ব্যথিত করেছে। তৃর্ণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে দলটিতে। যারা দলের জন্য নিবেদিত কর্মী, মেধা, টাকা ও পয়সা সব দিয়ে দলের জন্য কাজ করছেন তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। যেটা আমাকে চরমভাবে আঘাত করেছে। যারা নেতৃত্বে আছে তাদের থেকে অনেক নিবেদিত মানুষ দলে ছিল। কিন্তু তাদের প্রতি কোনো দৃষ্টি নেই।এছাড়া জাতীয় পার্টির নিজস্ব স্বকীয়তা নেই বলেও মন্তব্য করেন সোহেল রানা। একটি দলের আদর্শগত কিছু দিক থাকে দলটির সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় নেই। যাদের নিয়ে দল চালানোর চেষ্টা চলছে সেটা দলের জন্য ভালো হবে না। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।অনেকে অভিযোগ করেন যে, সরকারের সাথে আপস করে কোন বিরোধীদল বেশি দূর যেতে পারে না। পথ চলতে গয়ে তাকে বার বার হোচট খেতে হয়, যা হচ্ছে জাতীয় পার্টির বেলায়।’

আর আমাদের দেশের বামরাজনীতির ছোট দলের বড় বড় নেতারা, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে বড় বড় কথা বললেও কার্যত তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিই সার। কোন নির্বাচনে এমন কী স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনেও তাদের দেখা যায় বিছিন্নভাবে হাতেগোণা কিছু কিছু জায়গায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তারা জামানত নিয়ে ফিরতে পারে না।

শেষ করতে চাই এই বলেই যে, সাংগঠনিক শক্তি রাজনৈতিক দলের মূল ভিত্তি। এই শক্তির বলেই রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে এবং রাজনীতির মাঠে সক্রিয়ভাবে খেলতে পারে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বহু দল রাজনীতিতে সফল হয়েছে সাংগঠনিক শক্তির বলে আবার বিলুপ্ত হয়েছে সাংগঠনিক দুর্বলতায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,‘সনাতন কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে জনআকাক্সক্ষাকে ধারণ করতে পারছে না। স্থায়ী ও সুবিন্যস্ত কাঠামো না থাকায় দলগুলোকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হচ্ছে। বাংলাদেশে এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে, গণতন্ত্রের মুক্ত পাখি ডানা থেকেও কীভাবে পথ চলবে, কীভাবে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াবে তা তার জানা নেই। তার যেন বিশুদ্ধ বাতাস নেওয়ার মতো শক্তিশালী ফুসফুসও নেই। রাজনৈতিক শূন্যতা বলতে আদর্শিক রাজনীতির শূন্যতার কথা বলা হয়েছে। নদীতে স্রোত না থাকলে যেমন শৈবালের জন্ম হয়, জমির পরিচর্যা না করলে যেমন আগাছার জন্ম হয় তেমনি রাজনৈতিক শূন্যতা থাকলে বেড়ে ওঠে পরগাছা ও আগাছা। এই শূন্যতায় সাম্প্রদায়িক শক্তি দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। গুজব ছড়িয়ে তারা একজনকে পুড়িয়ে মেরেছে, বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে হত্যার শমন পাঠিয়েছে এবং হুঙ্কার দিয়ে বলেছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হবে।এসব কিছুই রাজনৈতিক শূন্যতার ফল। রাজনীতিকে যখন শীতলতা গ্রাস করে তখন সেঅবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা খুবই জরুরী হয়ে পড়ে, কিন্তু এসবের কোনো লক্ষনই বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেই। যা রাজনীতি সচেতন মানুষকে খুবই হতাশ করছে।তবে আশার কথা বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে দলের স্থবিরতা কাটাতে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছে।

লেখক: কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com