দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
‘বঙ্গমাতা সংকটে সংগ্রামে নির্ভীক সহযাত্রী’

‘বঙ্গমাতা সংকটে সংগ্রামে নির্ভীক সহযাত্রী’

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর নারী কবিতায় লিখেছেন, “সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমনী কোন ভেদাভেদ নাই। বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর-অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতার এ মর্মবাণী যেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমনি এর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন অথবা তাঁর অমর কীর্তিই নজরুলের কলমে প্রতিভাত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ।
মহিয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এর জন্ম ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তাঁর একানব্বই তম জন্মবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বঙ্গমাতা সংকটে সংগ্রামে নির্ভীক সহযাত্রী’। অত্যন্ত যথার্থ একটি প্রতিপাদ্যের আলোকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি করোনা মহামারির মধ্যেও শ্রদ্ধাভরে পালন করছে এ মহিয়সী ও নির্ভীক নারীর জন্মদিন। বাংলার মানুষের কাছে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার আরেক নাম বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো বটেই বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তিনি। সে কারণেই একটি জাতির মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন বপণ করে এর স্বাদও এনে দিতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে পেছন থেকে কাজ করেছেন শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু। বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ যেমন একই সূত্রে গাঁথা, তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও পরস্পর অবিচ্ছেদ্য নাম। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই বঙ্গমাতার নামটিও প্রচ্ছন্নভাবে চলে আসে। মাত্র ৩ বছর বয়সে বাবা এবং ৫ বছর বয়সে মাকে হারান বঙ্গমাতা। এরপর বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতার কাছে লালিত-পালিত হন তিনি। চাচাত ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তার দাদা বিয়ে দেন তাকে।
খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং সবশেষে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে যে নারীর অবদান অনস্বীকার্য তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু তার জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন বাংলার নিপীড়িত, অধিকার বঞ্চিত জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও সেবায়, সর্বোপরি দেশের কল্যাণে। এর মধ্যে বেশির ভাগ সময় বঙ্গবন্ধুকে কাটাতে হয়েছে জেলে। আর সেই সময়গুলোতে কাণ্ডারির মতো হাল ধরেছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ১৯৬৬ সনের ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আদায় ও জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করতে লিফলেট হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন বঙ্গমাতা। এসময় তিনি নিজের অলংকার বিক্রি করে সংগঠনের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের নেপথ্যেও ছিল তার সঠিক দিক নির্দেশনা। আন্দোলনের উত্তাল সময়গুলোতে নিজ বাড়িতে পরম মমতায় নির্যাতিত নেতা-কর্মীর আত্নীয় স্বজনদের আপ্যায়ন করতেন, সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনে ব্যবস্থা নিতেন। আশাহত নেতাকর্মীরা খুঁজে পেতেন আশার-আলো, আন্দোলনের জ্বালানি আসতো বেগম মুজিবের আশাজাগানিয়া বক্তব্য থেকে। শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন বঙ্গমাতা। স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গমাতা বলেন, ‘আমি তোমাদের মা।’ অনেক বীরাঙ্গনাকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন জীবনদান করেন তিনি।
বাঙালির অধিকার আদায় ছাড়া শেখ মুজিবের কাছে প্রধানমন্ত্রীত্ব বা ক্ষমতার কোনো মোহ ছিলো না। বঙ্গমাতাও সেই আদর্শে নিজেকে ও নিজের সন্তানদের গড়ে তোলেন। সহধর্মিণী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে আজীবন প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের কালজয়ী মহানায়ক শেখ মুজিবের অনুপ্রেরণাদায়িনী হয়ে পাশে ছিলেন।
কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে বঙ্গমাতাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশিয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে স্বাধীনতা বিরোধীদের মদদে এক দল সেনা কর্মকর্তা রাতের আধারে ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়িতে অতর্কিতে হানা দিয়ে ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ জগণ্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাদের শিশু পুত্র শেখ রাসেল, অপর দুই ছেলে শেখ কামাল এবং শেখ জামাল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল এবং রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ছোট ভাই শেখ নাসের, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার স্ত্রী আরজু মণিসহ কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও কর্মচারিবৃন্দ। সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান ওই সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আমি। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকীর এবারের প্রতিপাদ্য ‘বঙ্গমাতা সংকটে সংগ্রামে নির্ভীক সহযাত্রী’ যথার্থ হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য জাতির পিতার সঙ্গে আমার মাও একই স্বপ্ন দেখতেন। এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবন পাক, ভালোভাবে বাঁচুক এ প্রত্যাশা নিয়েই বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি সবসময় সজাগ ও দূরদর্শী ছিলেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একজন সাধারণ বাঙালি নারীর মতো স্বামী-সংসার, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরও বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমৃত্যু স্বামীর পাশে থেকে একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে দেশ ও জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর একমাত্র লক্ষ ছিল বাঙালির অধিকার আদায়। প্রধানমন্ত্রীত্ব বা ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনই স্পর্শ করতে পারেনি। বঙ্গমাতাও সে আদর্শে নিজেকে ও নিজের সন্তানদের গড়ে তুলেছেন। সহধর্মিণী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে আজীবন প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলার জনগণ তাকে ‘বঙ্গমাতা’ উপাধিতে ভূষিত করে। বঙ্গবন্ধুর জীবনে বঙ্গমাতা যেমন আলোকবর্তিতা, তেমনি আমাদের স্বাধীনতা ও দেশের মানুষের জন্য তার অবদান অনন্য অবিস্মরনীয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত বেশি আলোচনা হবে, বঙ্গমাতার অবদানও তত বেশি উদ্ভাসিত হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় মহিয়সী এ নারীর জন্মদিনে তার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর, কুমিল্লা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com