দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী লীগের দায়

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী লীগের দায়

ছবিঃ মাহবুবুল আলম

মাহবুবুল আলম।। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের দোষ আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার নীলনকশার অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের একটি ক্ষুদ্র অংশকে বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী সরকারে যোগদান করতে কাউকে কাউকে বাধ্য করা হয়েছিল, আর খুনি মোশতাক, মাহবুবুল আলম চাষিসহ অন্যান্যরা তো খুনের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিলই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কলঙ্কজনক ঘটনা জাতি হিসেবে আমাদের কপালে শুধু কলঙ্ক তিলক এঁকে দেয়নি বিশ্বদরবারে আমাদের পরিচিত করেছে হন্তারক এবং অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী ও পর্দার অন্তরালের খলনায়ক মুখোশ খুলে মঞ্চে হাজির হয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী ও তাঁর সরকারের সদস্যদের নিয়েই নতুন সরকার গঠন করেন, বঙ্গবন্ধু সরকারের সেনা ও বেসামরিক প্রশাসন এবং সংসদ বহাল রাখেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে হতবিহ্বল ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নিলেন আওয়ামী লীগেরই কিছু বিতর্কিত নেতা ও পাকিস্তানপন্থী আমলা এবং দালালদের। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ যখন সিড়িতে অবহেলায় পড়েছিল সেই রক্তাক্ত দেহ ডিঙ্গিয়ে মন্ত্রীসভায় শপথ নিয়েছিল সেই হার্মাদরা।
২৩ আগস্ট ২০২০ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ভিডিও কনফারেন্সিয়ের মাধ্যমে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,— “কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার প্রক্রিয়া শুরুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে- আমাদের দলের অভ্যন্তরে নানা খেলা শুরু হয়েছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দালালি করতে চেয়েছিল, তারা সমালোচনা মুখর হয়।” তিনি আরও বলেন-“সমালোচনার
প্রয়োজন আছে। কিন্তু এমনভাবে তাদের লেখনী এবং কার্যকলাপ ছিল, (দৃশ্যত) পরিকল্পিতভাবে সারাদেশে অপবাদ ছড়ানো হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জাতির পিতার জনপ্রিয়তা নস্যাৎ করা।” বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। যা এত বছর তিনি বুকের গভীরে লুকিয়ে রেখেছেন।
এখন আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে ৭৫’এর আওয়ামী লীগের
অনেক মিল পাওয়া যায়। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু যেমন একা হয়ে পরেছিলেন আজকে আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে তাই মনে হয়। মনে হয় শেখ হাসিনা এখন একা। আওয়ামী লীগে এখন কাক আর কাকে ভরা। ২০০৯ এবং ২০১৪ পরবর্তী সময়ে আওয়ামীলীগের এমন অসহায় অবস্থা চোখে পড়েনি। পরগাছায় পরগাছায় ভরা দেশের প্রাচীনতম দলটিকে যেনো চেনাই যায় না।
যাক, আজকের লেখার বিষয়বস্তু তা নয়। অবস্থার প্রেক্ষিতে খানিকটা লিখতে হলো। ১৯৭৫-এ যারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অনুসারী ছিলেন, সেইদিন তারা নিজেরা আত্মরক্ষার পথ বেঁছে নিয়েছিলেন। আর বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা বিরোধীরা বগল বাজিয়ে গণতন্ত্রের নামে বিপদগামী সেনা অফিসারদের স্বাগত জানিয়ে পথে নামে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা খুনি মোস্তাক সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছিল তা শোক দিবসে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান তার নিবন্ধে তুলে ধরেছেন তা এখানে উদ্ধৃত করা হলো-
” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ব্যর্থতা নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে ঔদাসীন্য কিংবা প্রশাসনিক অব্যবস্থা নয়, দলটির নেতা-কর্মীদের আদর্শবাদী হিসেবে গড়ে তুলতে না পারা। সুরক্ষিত ঘরে কিংবা আপন রক্ষীদের হাতে অনেক দেশের নেতা-নেত্রী খুন হয়েছেন। কিন্তু নেতার মৃতদেহ সিঁড়িতে রেখে তাঁর দলের লোকদের এভাবে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার নজির নেই। অস্বীকার করার উপায় নেই যে মুজিব সারা জীবন যে দলের নেতা-অনুসারীদের নিয়ে গৌরব বোধ করতেন, সেই দলের নেতাদের একাংশ তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল…।”
বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতায় কিছু তাত্ত্বিক নেতার অপকৌশলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ নামে নতুন দল করে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে গোপন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তাঁর সরকারকে অস্থির করে তুলেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এই দলের মূলমন্ত্র বলা হলেও বরখাস্ত হওয়া দুর্নীতিবাজ আমলা থেকে শুরু করে কট্টর স্বাধীনতাবিরোধীরাও ঠাঁই পেয়েছিল জাসদের পতাকাতলে! বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামে জাসদের গুপ্ত সংগঠনটি সরকারবিরোধী কর্মকান্ড বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের কথিত অভ্যুত্থানে ভারতবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক স্লোগানের নিচে তাদের তথাকথিত বিপ্লবের স্লোগান চাপা পড়ে যায়। রাতের অন্ধকারে গুপ্তহত্যা, ডাকাতি রাহাজানি পাটের গুদামে আগুন দেওয়াসহ নানাবিধ নাশকতামূলক কাজ করে যাচ্ছিলো, আর বদনাম হচ্ছিলো বঙ্গবন্ধু সরকারের।
অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থী আমলারা মিলে প্রশাসনিক সিন্ডিকেট
করে ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন দেশকে লুটের
রাজ্যে পরিণত করেছিল। সেই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ
চক্রান্ত, কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের ফসল হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে সুযোগ সন্ধানী, বর্ণচোরা পাকিস্তানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক চক্র, ৭১-এ পরাজিত পাকিস্তান ও প্রভাবশালী বিদেশি শক্তি এবং রাজকার-আলবদর গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। কেহ কেহ এটা বলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করেন- সেদিন বন্দুকের নলের মুখে তারা মোস্তাকের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। একথা ধোপে টিকে না, কেননা, সেই দিন সবাই বন্দুকের মুখে শপথ নেননি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম ও পৈশাচিক হত্যার ঘটনা
আমাদের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশের প্রবল সুবিধাবাদিতা ও আদর্শহীনতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রবীণ রাজনীতিক আতাউর রহমান খান স্বেচ্ছায় বাকশালের সদস্য হয়েও পরবর্তীকালে ১৫ আগস্টকে ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করেছিলেন। যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জুন মাসে সন্তোষে মুজিবের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন, তিনিই আবার ১৫ আগস্টের পর মোশতাক সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে সংবর্ধনা নিয়েছিলেন, তিনিই আবার ১৫ আগস্টের পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। তাই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এর দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না।
“বড় গাছ থেকে এখনই আগাছা দূর করা দরকার”। এই শিরোনামে
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট জনাব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর
দৈনিক যুগান্তরে সাম্প্রতিক লেখা কলামের অংশবিশেষ এখানে
উদ্ধৃত করে লেখাটি শেষ করবো। “গাছ যখন বুড়ো হয়, তাতে আগাছা জন্মে। এই আগাছা সময়মতো পরিষ্কার করা না হলে তাতে নানা ধরনের কীট বাসা বাঁধে। তারা গাছটাকে খেতে শুরু করে। গাছটি মাথা উঁচু করে তারপরও দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সামান্য ঝড়ে পড়ে যায়।… আমার ভয় হয়, আওয়ামী লীগ নামক প্রাচীন সংগঠনটিরও আজ এই অবস্থা। এত আগাছা জন্মেছে এবং এত কীট গাছটির শেকড় খেতে শুরু করেছে যে, ভয় হয় এই গাছটি না হঠাৎ পড়ে যায়। তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য এক চরম দুর্ভাগ্য।
…অবশ্য একটি গণতান্ত্রিক দলে এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয়। সেখানে সবারই অবাধ অধিকার। ভারতের কংগ্রেসে যা ঘটেছে, বাংলাদেশের আওয়ামী লীগেও তাই ঘটছে। দুটি দলই এখন বৃদ্ধ বনস্পতি। কংগ্রেসের নেতৃত্ব নেহেরু পরিবারের হাতে। তারা অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও অসংখ্য সাম্প্রদায়িক নেতা ও কর্মী কংগ্রেসে অনুপ্রবেশ করেছে। আজ আর কংগ্রেস আগের সেই দল নেই। আজ আওয়ামী লীগেরও শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক; কিন্তু দলে বানের জলের মতো সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ এবং নীতিহীন ও চরিত্রহীন মানুষের দল ঢুকে পড়েছে।
এই আওয়ামী লীগে যদি কঠোর হাতে পরগাছা বর্জন শুরু না হয়, তাহলে আমার সন্দেহ হয়, কেবল টাকাওয়ালা মানুষকে নির্বাচনে নমিনেশন দিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হবে কিনা।”
লেখক: কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক ও গবেষক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com