দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
সংবাদ শিরোনাম
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রী শিক্ষা জাতীয়করণ প্রসঙ্গে সংসদে আপনাদের বক্তব্য চাই করোনা বৃত্তান্ত।। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু এবং আক্রান্ত শনাক্ত দু’টোই বেড়েছে করোনার গ্যাঁড়াকলে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা।। বিপর্যস্ত শিক্ষাপঞ্জি চরম বিপাকে বেসরকারি শিক্ষকরা সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব পরিকল্পনা জরুরি শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা তলানীতে! আমি শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর এ নহে মোর অপরাধ মোবাইল গেমসঃ একটি ভয়াবহ ব্যাধি তিতাসে বাংলাদেশ শিক্ষা সেবা ফাউন্ডেশনের বৃক্ষ রোপণ এ বছরও হজ্বযাত্রী পাঠানো বন্ধ থাকবে- সংসদে অর্থমন্ত্রী মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রী শিক্ষা জাতীয়করণে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ নিন ৫০ বছরে ৭৮৬ কোটি থেকে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ হাজার কোটি টাকার বাজেট
করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাখাত

করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাখাত

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে গোটাবিশ্ব এখন মৃত্যুপূরী। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সবকটি দেশেই করোনার নিষ্ঠুর থাবা। কোথাও কোন ভালো খবর নেই। প্রিন্টিং ও ইলেকট্রণিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার যেদিকে চোখ রাখি শুধু আক্রান্ত আর মৃত্যু সংবাদ। ভালো সংবাদ যেন সোনার হরিণ। ভালো খবরের জন্য মানুষ আজ তৃষ্ণার্ত। করোনার হিংস্র থাবায় অচল জীবনজীবিকা ও অর্থনীতির চাকা, বিপর্যস্ত শিক্ষাপঞ্জি, চরম বিপাকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দুর্দশার অন্ত নেই।
করোনার হিংস্র থাবায় থমকে গেছে জনজীবন, অর্থনীতি স্থবির। স্বাস্থ্যখাত হিমসিম খাচ্ছে তাদের সেবা চালু রাখতে। করোনা রোগীর সেবা দিতে গিয়ে অন্যান্য রোগীদের অবস্থা ত্রাহিত্রাহি। তবে একদিন করোনা সংক্রমণ শেষ হয়ে যাবে, জনজীবন আবার স্বাভাবিক হবে, অর্থনীতির চাকাও সচল হবে। কিন্তু শিক্ষার যে অপুরণীয় ক্ষতি হলো তার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন। প্রাথমিক বলি আর মাধ্যমিক বলি কিংবা উচ্চতর শিক্ষা সর্বক্ষেত্র করোনার হিংস্র থাবায় বিপর্যস্ত শিক্ষাপঞ্জি। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন ছাড়া এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া আদৌ সম্ভব নয়।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে কোচিং সেন্টারও। দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়ে আগামী ২২ মে পর্যন্ত ছুটি বর্ধিত করা হয়েছে। এতে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চলেছে। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষায় একটি গতি এসেছিল। শহর এবং গ্রামের মধ্যে শিক্ষায় ব্যবধান কমে এসেছিল। সেটি এখন প্রচন্ড হোঁচট খাবে। শ্রমজীবী অনেক পরিবারের সন্তানদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা আছে। বেড়ে যেতে পারে বাল্যবিবাহের হার। আরও নানা সমস্যা হবে যা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমখি করে তুলবে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করে বাস্তবতার নিরিখে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে শিক্ষাপঞ্জিকে।
করোনা মহামারিতে প্রায় ১৫ মাস ধরে বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি পাঠদান। বন্ধ আছে সব ধরনের পরীক্ষা। থমকে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম। তবে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতির পাঠদান চলছে। কিন্তু তাতে শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না। বরং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দফায় দফায় পিছিয়ে যাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ। আগামী ২৩ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত থাকলেও করোনা সংক্রমণের বর্তমান হার বজায় থাকলে তা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। সার্বিক বিশ্লেষণে পৌনে ৪ কোটি ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। করোনায় শিক্ষার যে ক্ষতি হয়েছে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি এবং সুদূরপ্রসারী। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা চরম নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। তাই সার্বিক শিক্ষা পুনরুদ্ধারে সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেয়া খুবই জরুরি।
দেশের অধিকাংশ অভিভাবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পক্ষে হলেও সংগত ও যৌক্তিক কারণেই বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারের নিকট এর বিকল্প কিছু নেই। তাই বাতিল করা হয়েছে ২০২০ সালের জেএসসি, জেডিসি এবং পিইসি পরীক্ষা। অর্ধবাষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি। দেয়া হয়েছে অটোপাস। এইচএসসিতেও জেএসসি ও এসএসসি’র ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে অটোপাস দেয়া হয়েছে। টেলিভিশন, অনলাইন, বেতার ও মুঠোফোনের মাধ্যমে সরকার পড়াশোনা চালু রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া কতটুকু সফল হয়েছে তা বিবেচনার দাবি রাখে।
কীভাবে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়, তা নিয়ে সব উন্নয়নশীল দেশই হিমশিম খাচ্ছে। এটি আমাদের জন্যও বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে মূল্যায়ন হয় শ্রেণিকক্ষে, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এবং পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু করোনার কারণে সব থমকে গেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ৯ মাসে লেখাপড়ার একটা বড় ক্ষতি হয়েছে। এরপর গত ৫০ বছরেও শিক্ষায় এতবড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। এখন এ ধকল কাটিয়ে উঠতে উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন একান্ত আবশ্যক।
গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ বছর ৩০ মার্চ খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হলেও করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ছুটি ২২ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের জন্য অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে বিকল্প পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব শিক্ষার্থীর কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে অংশ নিয়েছে। ব্র্যাকের সমীক্ষা মতে, টেলিভিশন পাঠদানে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ অন্তত অর্ধেক শিক্ষার্থীই দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের বাইরে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণের অধীনে এসেছে। আর স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ৮৫ শতাংশকে লেখাপড়ার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।
এবার আসা যাক মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের কথায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা করোনাকালে প্রাপ্য সুবিধাদি ষোল আনা পেলেও বিপাকে পড়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, স্বল্প বেতনভোগী বেসরকারি শিক্ষকরা সাধারণত প্রাইভেট টিউশনী ও কোচিংয়ের এর উপর নির্ভর করে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে থাকেন। যা এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা বিদ্যালয় থেকে কিছু বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বন্ধ থাকায় এখন এটাও নেই বললেই চলে। বিশেষ করে নন-এমপিও এবং কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকরা আছেন চরম বিপাকে। মোদ্দাকথা বেসরকারি শিক্ষকরা এখন মোটেও ভালো নেই। তারা না পারছে কইতে না পারছে সইতে।
করোনায় শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে উঠার লক্ষে এবং শিক্ষার চাকা সচল রাখার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থীরা প্রিটেস্ট বা টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা দশম শ্রেণিতে ক্লাস করতে পেরেছে মাত্র আড়াই মাস। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা দ্বাদশ শ্রেণিতে অটো পাশ নিয়ে উঠেছে। দ্বাদশ শ্রেণিতে একদিনও সরাসরি ক্লাস করতে পারেনি তারা। এ কারণে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচিতে তাদের পরীক্ষা নেয়া হবে। অন্যদিকে গত বছর বিলম্বে ভর্তি করা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষার সময় এসে গেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা একদিনও ক্লাসে বসতে পারেনি। একই অবস্থা ২০২১ সালের জেএসসি পরীক্ষার্থীদের। শ্রেণি পাঠদান ছাড়াই তাদের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বছরের জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মে মাসে স্কুল কলেজ খোলা সম্ভব হলে পরীক্ষার আগে যথাক্রমে ৬০ ও ৮৪ দিন ক্লাস নেয়ার কথা আছে এসব পরীক্ষার্থীর। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেটা কতটা সম্ভব হবে সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদিও এসএসসি পরীক্ষা নেয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা বোর্ডগুলো ফরম পূরণ অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া প্রশ্নপত্র তৈরি ও মুদ্রণের কাজ করে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড সুত্রে জানা যায়।
সে যাই হোক সমস্যা যেখানে আছে তার সমাধানও রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিধ ও পরিকল্পনাকারী। অত্যন্ত দুরদর্শিতা ও দক্ষতা বলে তিনি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আশা করি করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে তিনি যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যাণয়, মুরাদনগর, কুমিল্লা

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com