দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া শিক্ষা জাতীয়করণ ‘সোনার পাথর বাটি’

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া শিক্ষা জাতীয়করণ ‘সোনার পাথর বাটি’

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ৪৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন— “সুজলা সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরীব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।” বঙ্গবন্ধু তার এ উক্তির মাধ্যমে একটি সুশিক্ষিত জাতির কথাই বলেছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার তাগিদ অনুভব করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের দেশের শিক্ষা এখনও সুদৃঢ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপ প্রশ্নাতীত নয়। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষার অবস্থা তথৈবচ। শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। এদিকে শিক্ষক সংগঠনগুলোও প্রায় নিস্ক্রিয় বলা যায়। যেটুকু তৎপরতা লক্ষ্যকরা যায় তা শুধু কাঁদা ছুড়াছুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
দেশের পাঁচ লক্ষাধিক এমপিওভূক্ত শিক্ষকের হদয়ে আজ রক্তক্ষরণ হচ্ছে। জাতীয়করণসহ বিভিন্ন দাবিতে তারা আন্দোলনরত। সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে প্রাপ্য সুবিধাদির মধ্যে চলমান বৈষম্য আকাশপাতাল। পাহাড়সম এ বৈষম্য নিরসনে শিক্ষকরা রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। কিন্তু তাদের এ আন্দোলন আদৌ ফলপ্রসু হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে দেয়, রাজপথে আন্দোলন ছাড়া কখনই বড় কিছু অর্জন করা সম্ভবপর হয়নি। শিক্ষা জাতীয়করণের মত এত গুরূত্বপূর্ণ একটি বিষয় সহজেই অর্জিত হবে এটা ভাবা আদৌ সমীচীন নয়। কেননা এটি একটি জাতীয় ইস্যু। তাই বিচ্ছিন্নভাবে দাবি জানিয়ে কিংবা আন্দোলন করে সুফল পাওয়া কঠিন। কথায় আছে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই জয় হয়। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে জাতীয়করণের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি জাতীয়করণের দাবি আদায়েও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। অন্যথা শিক্ষা জাতীয়করণ ‘সোনার পাথর বাটি’ হিসেবে অধরাই থেকে যাবে।
রাজপথে এবং অলিতে গলিতে “হৈ হৈ রই রই- অমুকে গেল কই?” শ্লোগানটি যখন শুনতাম, খুব বিরক্তি প্রকাশ করতাম। ভাবতাম এটা আবার শ্লোগান হয় নাকি? আজ শিক্ষকতা জীবনের পঁচিশ বছর পর শিক্ষক নেতাদের লুকোচুরি খেলা দেখে এ শ্লোগানটিই বারবার মনে পড়ছে। এজন্য শিক্ষক বন্ধুদের নিকট দুঃখ প্রকাশ করছি এবং ক্ষমাপ্রার্থীও বটে। বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। দেশের পাঁচ লক্ষাধিক এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের প্রাণের দাবি মুজিববর্ষেই জাতীয়করণ ঘোষণা দেয়া হোক। এ দাবি আদায়ে মাঠে ময়দানে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রিন্টিং মিডিয়ায় সাধারণ শিক্ষকরা যতটা সোচ্চার বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতারা ততটা আন্তরিক নয়। নেতাদের নিরবতায় সাধারণ শিক্ষকরা এখন ক্ষুব্ধ।
১৭২৫ টাকায় শিক্ষকতা জীবন শুরু। অনেক কষ্টে জীবনের চাকা সচল রেখেছি। নির্ভর করেছি প্রাইভেট টিউশনীর উপর। এখন এটার উপরও সরকারি আইনের খড়গ! যদিও প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুযোগও নেই। অনুদান যা পাই তা দিয়েই সংসার চালাই। অবশ্য প্রতিষ্ঠান থেকেও কিছু পাই। জানি অনেকে চুরির অপবাদ দিবেন। এটা সবার ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা অথচ গ্যাস বিল ৯৭৫ টাকা, ঈদ বোনাস ২৫%, কিন্তু একপায়া গরু কই পাই? চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। এক্ষেত্রে অবশ্য মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত আছে। আমার কোন ওষুধ লাগে না। সন্তানের শিক্ষা ভাতা? শিক্ষকের সন্তান আপনা আপনি মানুষ হবে! বিনোদন ভাতা? কি যে বলেন, শিক্ষক আবার বিনোদন করে নাকি? বদলি সোনার হরিণ। পঁচেগলে মরলেও চাকরি যেখানে শুরু সেখানেই শেষ।
ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইলাম। এবার আসল কথায় আসা যাক। দারিদ্র্যতা আমাদের চারিত্রিক ভূষণ। কিন্তু মর্যাদা? তাও তো এখন তলানীতে। আমি জাতীয় বেতন স্কেলের ৭ম গ্রেডের অন্তর্ভূক্ত। অথচ আমার উপর খবরদারি করে কয়েক গ্রেড নিচের সরকারি কর্মকর্তারা। কারণ আমার রাইফেল আছে গুলি নাই।
আশায় বুক বেঁধেছিলাম। সরকার হয়তো ২০২০ সালের মধ্যে জাতীয়করণ করবে। এতে শ্যাম কুল দুইই রক্ষা হবে। কিন্তু সে আশাও এখন গুড়েবালি হয়েছে। আর হবেই না বা কেন? শিশু না কাঁদলে মাই তো দুধ দেয় না। অথচ অর্ধশত শিক্ষক সংগঠন থাকলেও নেতারা সব নিখোঁজ। দু’একটি সংগঠন ছাড়া অন্যদের কোন আওয়াজ নেই বললেই চলে। যা শোনা যায় সবই ফাঁকা বুলি! সবাই যেন দৃষ্টির অন্তরালে। নেতারা সব ঘুমোচ্ছে, আমার মতো কুলোর বলদেরা ফেসবুকে চেচাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে কর্তৃপক্ষ খোশমেজাজে আছে। অনেক আগে বেনবেইসে একবার এনআই খান স্যারের সাথে এ বিষয়ে একান্তে কথা হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমি আন্তরিক। তবে কুম্ভকর্ণ নেতাদের দিয়ে কিছুই হবে না। তাঁর এ বক্তব্যই আজ সত্য হলো।
কমবেশি আমরা সকলেই অবগত “সময়ের এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়।” মুজিববর্ষে জাতীয়করণ চাইলে এখনই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সকল দ্বিধাদন্বন্ধ পরিহার করে সকলে একমঞ্চে উঠে আন্দোলনের ডাক দিলে বর্তমান শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দেবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
প্রধান শিক্ষকঃ পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর, কুমিল্লা।, ০১৮১৮৬৬৪০৩৪, alauddinhm71@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com