দৃষ্টি আকর্ষণঃ
আমাদের ভূবনে স্বাগতম। আপনাদের সহযোগিতাই আমাদের পাথেয়।
একটি নক্ষত্রের প্রয়ান অব্যক্ত বয়ান

একটি নক্ষত্রের প্রয়ান অব্যক্ত বয়ান

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মাস্টার।। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক, জাতীয় সংসদে সরকারী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য বর্ষীয়ান পার্লামেন্টেরিয়ান অধ্যাপক আলী আশরাফ ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
৩০ জুলাই, শুক্রবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধ্যাপক আলী আশরাফ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। গত ১০ জুলাই তাঁকে স্কয়ার হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৩ জুলাই তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। ২১ জুলাই তাকে ‘লাইফ সাপোর্টে’ নেয়া হয়। আজ তিনি এ ধরাধাম থেকে চির বিদায় নিলেন। তাঁর মৃত্যুতে কুমিল্লার সর্বমহলে শোকের ছায়া নেমে আসে
কুমিল্লা জেলার রাজনৈতিক অঙ্গণের উজ্জল নক্ষত্র সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক মোঃ আলী আশরাফ এমপি ১৯৪৫ সালের ১৭ নভেম্বর চান্দিনা উপজেলার গল্লাই গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। চান্দিনা উপজেলার সর্বজন শ্রদ্বেয় ব্যক্তিত্ব মাওলানা আলহাজ্ব ইসমাইল হোসেন মুন্সী এবং শামসুন্নাহার বেগম এর গর্বিত সন্তান অধ্যাপক মোঃ আলী আশরাফ এমপি স্বাধীনতা পূর্বকালীন সময় থেকেই চান্দিনার গণমানুষের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রাবস্থায়ই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন অধ্যাপক আলী আশরাফ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ লালন করে প্রায় ৫০ বছর ব্যাপী কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গণে অবাধ বিচরণ করে তিনি এখন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছেন। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন এবং এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। তিনি ১৯৭৩ সাল থেকে অদ্যাবধি সংসদ সদস্য হিসেবে চান্দিনা ও দেশের মানুষের কল্যাণে নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় তিনি জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পীকার ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায় কমিটির সভাপতি ও সদস্য হিসেবে দ্যুতি ছড়িয়েছেন।
নির্বাচন প্রেমী অধ্যাপক আলী আশরাফ ৭০ এর নির্বাচনে স্বতন্ত্র্য প্রার্থী হিসেবে প্রথম নির্বাচন করে হেরে গেলেও দমে যাননি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র্য প্রার্থী হয়ে ফের নির্বাচন করেন। অর্জন করেন কাঙ্খিত বিজয়। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাজি রমিজ উদ্দিনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তাক লাগিয়ে দেন।
এরপর থেকে বিতর্কিত ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া সবক’টি নির্বাচনেই তিনি প্রার্থী হন। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে স্বতন্ত্র্য প্রার্থী হিসেবে এবং ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হন।
১৯৭৩ পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য পদ থেকে ছিটকে পড়লেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত অধ্যাপক আলী আশরাফ আওয়ামী লীগ ছাড়েননি। তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের মাটি ও গণমানুষের নেতা সাবেক ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্য আলহাজ্ব অধ্যাপক আলী আশরাফ শুধু কুমিল্লা নয় সারা বাংলাদেশে একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত এ রাজনীতিক ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ভদ্র, নম্র, ধার্মিক ও কোমল মনের মানুষ হিসেবে বেশ সমাদৃত। তিনি অতি সহজে তার আচার-ব্যবহার দিয়ে যে কোন শ্রেণিপেশার মানুষকে আপন করে নিতে পারেন এবং এলাকার সর্বস্তরের মানুষ সহজেই তাদের যেকোন সমস্যার কথা তার কাছে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করতে পারেন। এ কারণেই তিনি নির্বাচনী এলাকার মানুষের মাঝে বেশ জনপ্রিয়। তার এ জনপ্রিয়তার কারণেই ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাজী রমিজ উদ্দীনকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে স্বতন্ত্র্য প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে সাধারণ মানুষের মন জয় করে নেন এবং আজও এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করার পর রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসলেও তিনি তার নীতি আদর্শকে ধরে রেখে দুর্দিনেও আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে পিছপা হননি। বিভিন্ন ঝড়-ঝপটা মোকাবিলা করেই তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগকে আগলিয়ে রেখেছেন। তার একনীতি এক রাজনীতির কারণে চান্দিনার মানুষ তাকে ভালোবেসেছে মনেপ্রাণে এবং তাকে প্রতিটি নির্বাচনের সময় দলমত নির্বিশেষে সবাই ভোট দিয়ে এমপি নির্বাচিত করেন। তাছাড়া অধ্যাপক আলী আশরাফ পারিবারিক ঐতিহ্যানুযায়ী একজন ধর্মানুরাগী ও নামাজি ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত। তিনি সকল মানুষকে তাদের ধর্মীয় কাজকর্ম সঠিক ভাবে আদায় করার জন্য তাগাদা দিয়ে থাকেন। তাছাড়া তিনি এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সকলকে ধর্মীয় কাজের ব্যাপারে
দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
অধ্যাপক আলী আশরাফ একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে নিজ এলাকাকে নিরক্ষরমুক্ত করার মানসে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিভিন্ন মাদ্রাসাসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি যখনই ঢাকা থেকে নিজ নির্বাচনী এলাকায় আসেন, তখন এলাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং খোঁজ-খবর নেন কোন প্রতিষ্ঠানে কি রকম লেখাপড়া হয়? কোন প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের অথবা শিক্ষকদের কোন সমস্যা আছে কিনা? অনেক সময় তিনি নিজেই ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান করানোরও যথেষ্ট নজির রয়েছে।
১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ফ্রিডমপার্টির নেতা কর্ণেল (অব:) খন্দকার আঃ রশিদ ও বিএনপির পার্থী এডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ কে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে কর্ণেল রশিদ গোপনে দেশ ত্যাগ করেন। তখন থেকেই তিনি চান্দিনার মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তনে ব্যাপক কাজ করেন। এলাকার রান্তা-ঘাট হতে শুরু করে এমন কোন স্থান নেই যেখানে তার উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ২০০০ সালে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে প্রচুর ভোট পেলেও রহস্যজনক কারণে তিনি হেরে যান। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর চালানো হয় ব্যাপক নির্যাতন। সারাদেশের ন্যায় চান্দিনাতেও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর চলে নির্যাতনের ষ্ট্রীমরোলার। ওই দুঃসময়েও তিনি সার্বক্ষণিক নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন।
২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অধ্যাপক আলী আশরাফ আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিএনপির প্রার্থী খোরশেদ আলম ও এলডিপির প্রার্থী এডভোকেট রেদোয়ান আহমেদ কে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিএনপি প্রার্থী রেদোয়ান আহমেদ কে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পারিবারিক জীবনেও অধ্যাপক আলী আশরাফ অত্যন্ত সফল। তিনি এক ছেলে এবং তিন মেয়ে সন্তানের জনক। সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে মুনতাকিম আশরাফ টিটু দেশের বিশিষ্ট্য ব্যবসায়ী ও এফবিসিসিআই’র ভাইস-প্রেসিডেন্ট।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2019 www.kalpurushnet.com